দুর্নীতি পাহাড়ে নির্বিকার আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মেহমুদ

নিজস্ব প্রতিবেদক: আইএফআইসি ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন বোর্ডের কার্যক্রম নিয়ে ব্যাংক খাতের মধ্যে উদ্বেগ তীব্র হচ্ছে।

ব্যাংকের বিভিন্ন সূত্রের দাবি, তার নেতৃত্বে ব্যাংকের নীতি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ত্রুটি ও অনিয়ম ঘটেছে। যা পর্যবেক্ষণের জন্য ইতোমধ্যে পর্যবেক্ষক নিয়োগে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আইএফআইসি ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি–সেপ্টেম্বরের মধ্যে লোকসান দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা, যেখানে ২০২৪ সালের একই সময়ে মুনাফা ছিল মাত্র ৭০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার অবনতি লক্ষণীয়।

একই সময়ে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৫৫ কোটি টাকায়, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ৬০.৬৩ শতাংশ। যেখানে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৪,৩৮৯ কোটি টাকা, মোট ঋণের ৯.৯২ শতাংশ। এক বছরের মধ্যে খেলাপি ঋণ ৫১৬ শতাংশ বেড়েছে।

ডেপুটি গভর্নর কবিরের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি বোর্ড এবং চেয়ারম্যানের নেতৃত্বের ব্যর্থতার প্রমাণ। ব্যাংকের আর্থিক সূচকগুলোর অবনতি, সুশাসনের ঘাটতি এবং অনিয়ম রোধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে।

চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে আইএফআইসি ব্যাংকের বর্তমান ডিএমডি শেখ আখতার উদ্দিন আহমেদ ন্যাশনাল ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকালে ৯০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি করেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ডলার কারসাজি এবং নির্দিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার কারণে ব্যাংকের এই ক্ষতি হয়।

তদন্ত চলাকালে দুদক তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। এ সব ঘটনার মধ্যেও তিনি আইএফআইসি ব্যাংকে ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে নিযুক্ত হন এবং বর্তমানে বহাল তবিয়তে আছেন। ব্যাংক-খাতের বেশ কয়েকজন সূত্র জানাচ্ছেন, এই নিয়োগের পেছনে চেয়ারম্যানের অনুমতি ও ঘনিষ্ঠতার প্রভাব রয়েছে।

৬ এনবিএফআইয়ের জিম্মি আমানত, ফেরতের দাবিতে ক্ষতিগ্রস্তদের

চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে আইএফআইসি ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে অযোগ্য এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নিয়োগ এবং পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক, আঞ্চলিক প্রধান এবং বিভাগীয় প্রধানদের নিয়োগে স্বচ্ছতা ছিল না। অনেক কর্মকর্তা ব্যাংকিং খাতের মূলধারার অভিজ্ঞতা ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়। এ ধরনের নিয়োগ ব্যাংকের খরচের খাত ভারী করেছে এবং আর্থিক অস্থিরতা বাড়িয়েছে।

শেখ আখতার উদ্দিন আহমেদের তত্ত্বাবধানে মার্কেটিং বিভাগের সাবেক প্রধান সালাহ উদ্দিনকে সহায়তার উদ্দেশ্যে কর্পোরেট হিসাব থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ রিলিজের ব্যবস্থা করা হয়। এসব নিয়োগ ও পদোন্নতি চেয়ারম্যানের অনুমতি ছাড়া সম্ভব ছিল না বলে খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের শেষের দিকে আইএফআইসি ব্যাংকে ফরেক্স রিজার্ভ অ্যান্ড ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট-১-এর পরিচালক এ কে এম কামরুজ্জামানকে পর্যবেক্ষক নিযুক্ত করে। পর্যবেক্ষকরা পরিচালনা পর্ষদ, নির্বাহী কমিটি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় অংশ নিয়ে কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন। ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর সরাসরি নজরদারি বাড়ানোই এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক ও বোর্ডের ব্যর্থতার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই পদক্ষেপ নিয়েছে।

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক যখন কোনো ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় গলদ দেখতে পায়, তখনই পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা হয়।’

আইএফআইসি ব্যাংকের বোর্ড ২০২৪ সালে বিদেশ সফরে গিয়েছিল, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিশেষ অর্থ মজু করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বোর্ড তা পালন করেনি বলে ব্যাংক সূত্রগুলো জানাচ্ছে। এই ব্যর্থতা এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণে অবহেলা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পর্যবেক্ষক নিযুক্ত করতে বাধ্য করেছে।

আইএফআইসি ছাড়াও ন্যাশনাল, প্রিমিয়ার এবং আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে। মূলত এসব ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠায় অতিরিক্ত তদারকির প্রয়োজন দেখা দেয়। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা কার্যক্রম, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক অবস্থার ওপর সরাসরি নজরদারি জোরদার করা হচ্ছে। তবে প্রশ্ন উঠছে—যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদেরই পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, একটা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছে। বারবার সুযোগ দেওয়ার পরও পারফরম্যান্সে কোনো পরিবর্তন না হলে রেগুলেটর হস্তক্ষেপ করে। আইএফআইসি ব্যাংক তার ব্যতিক্রম নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানও বলেন, ‘পর্যবেক্ষক বসানো বোর্ডের ব্যর্থতার কারণে নয়, বরং ব্যাংকের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য।’

চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হোসেন এবং ব্যাংকের অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তা নিউজের জন্য প্রতিক্রিয়া দেননি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকও আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগগুলো অস্বীকারও করেনি।

আইএফআইসি ব্যাংকের আর্থিক সূচক, খেলাপি ঋণের পরিমাণ এবং পর্যবেক্ষক নিয়োগের প্রেক্ষাপটে বোর্ডের কার্যক্রম এবং চেয়ারম্যানের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রশ্ন ওঠেছে। ব্যাংকের আর্থিক অস্বচ্ছতা, অনিয়মপূর্ণ নিয়োগ, বিদেশ সফরে ব্যর্থতা এবং সুশাসনের অভাব কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্যাংকের পরিচালনা ব্যবস্থার কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য এখনই প্রয়োজন কঠোর নজরদারি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, কয়েকটা ব্যাংকে পর্যবেক্ষক বসানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংক আরও আগেই নিয়েছে। ব্যাংকের বোর্ডের সঙ্গে মিলে তারা কাজ করবে। ব্যাংকের বোর্ডের ব্যর্থতার কারণে পর্যবেক্ষক বসানো হয়েছে কি-না? আর বোর্ড ব্যর্থ হলে ভেঙে না দিয়ে কেন পর্যবেক্ষক বসানো হলো, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা বোর্ডের ব্যর্থতার বিষয় নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন মনে করছে পর্যবেক্ষক বসানো দরকার, এ জন্য বসিয়েছে। বিশেষ কোনো কারণ নয়।

—জা.অর্থনীতি/এনজে