নিজস্ব প্রতিবেদক: ‘ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে ন্যাশনাল ব্যাংকের ৯০৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে’ বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহাম্মদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুদক।
কবীর আহাম্মদ ছাড়াও আরও ২৫ জনকে এই মামলায় আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন- ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক পরিচালক রন হক সিকদার, পারভীন হক সিকদার ও মনোয়ারা সিকদার। সম্প্রতি দুদক মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন এই মামলা দায়ের করেন।
ড. মো. কবির আহাম্মদ প্রসঙ্গে দুদক বলছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৯-এর উপধারা (১) অনুসারে ন্যাশনাল ব্যাংকের আর্থিক সূচকসমূহের ক্রমাবনতি এবং সুশাসনের অভাব পরিলক্ষিত হওয়ায় তাকে অবজার্ভার হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছিল।
পর্যবেক্ষক নিয়োগের শর্তে উল্লেখ করা হয়েছে, ৩ কার্যদিবস পূর্বেই পর্যবেক্ষককে বোর্ড সভার আলোচ্যসূচি প্রেরণ করা হয়। ৪৩৩তম বোর্ড সভায় মোট ৬ জন পরিচালক ও পর্যবেক্ষক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি ড. মো. কবির আহাম্মদ উপস্থিত ছিলেন। তাদের সকলের সম্মতিতে সকল রীতি-নীতি উপেক্ষা করে নিয়মবহির্ভূতভাবে অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে ঋণ আবেদনের মাত্র ৬ দিন (৪ কার্যদিবস)-এর মধ্যে বোর্ড সভায় ওই ঋণ প্রস্তাবের অনুমোদন দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে পর্যবেক্ষকের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন না করে ঋণ অনুমোদনে সহায়তা করেন বলে দুদক প্রমাণ পেয়েছে।
ব্যাখ্যায় পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব ও কর্তব্য বিষয়ে বলা হয়, ঋণ, বিনিয়োগ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সিকিউরিটি ও জালিয়াতি প্রতিরোধ সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পরামর্শসহ বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলে তা তুলে ধরতে হবে। একইসঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গঠনমূলক পর্যবেক্ষণ দিতে হবে। এছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে পরিচালনা পর্ষদ সভায় নোট অব ডিসেন্ট দিতে হবে। নিয়ম হচ্ছে, পর্যবেক্ষককে সভা শেষে এক দিনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও তাৎক্ষণিক মতামতের সারসংক্ষেপ জমা দিতে হবে। এছাড়া সভার সাত দিনের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। এক্ষেত্রে তিনি ঋণের সমুদয় অর্থ উত্তোলনের মাধ্যমে আত্মসাতের প্রায় এক মাস পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব অফ-সাইট সুপারভিশন (ডিওএস) বরাবর প্রতিবেদন দাখিল করেন। আত্মসাতের ঘটনায় ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ‘ভুয়া ও জালিয়াতির’ মাধ্যমে তৈরি করা ‘সাব-কন্ট্রাক্ট অ্যাগ্রিমেন্ট’ দেখিয়ে সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকার সময় ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড থেকে ৬০০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন ও উত্তোলন করা হয়েছিল, যা সুদে-আসলে বেড়ে ৯০৩ কোটি টাকা হয়েছে। সিকদার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা জয়নুল হক সিকদারের গড়ে তোলা ব্যবসায়িক ‘সাম্রাজ্য’ তার স্ত্রী ও সন্তানদের হাতে এসে পড়ে। তার সন্তান রন ও রিকের বিরুদ্ধে গত কয়েক বছর ধরেই নানা অভিযোগ আসছিল সংবাদমাধ্যমে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপে তারা ব্যাংকের পরিচালক পদও হারিয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের এক মামলায় ইত্যোমধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে। এছাড়া একাধিক মামলা হয়েছে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, ব্লুম সাকসেস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ৬০০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করা হয়। পরে নগদ উত্তোলন, পে-অর্ডার ও ছাড়ের মাধ্যমে অর্থ ‘স্থানান্তর, রূপান্তর ও হস্তান্তর’ করে ঋণের অর্থ ‘আত্মসাৎ’ করা হয়।
দুদকের হিসাবে, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনাদায়ী ঋণের সঙ্গে সুদ ও অন্যান্য মাশুল যুক্ত হয়ে মোট আত্মসাৎ বা ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯০৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
এজাহারে বলা হয়, ব্লুম সাকসেস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ জালাল খান মজলিশ ও পরিচালক খাদিজা আক্তার ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ন্যাশনাল ব্যাংকের দিলকুশা শাখায় প্রতিষ্ঠানের নামে একটি হিসাব খোলেন।
হিসাব খোলার দিনই বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি বড় প্রকল্পের কাজের অজুহাতে তিন বছর মেয়াদি ওডি (কার্যাদেশ) ঋণ সুবিধা হিসেবে ৬০০ কোটি টাকার আবেদন করা হয়।
আবেদনে পর্যাপ্ত জামানত দেওয়ার কথা বলা হলেও জামানত সংক্রান্ত কোনো বিস্তারিত তথ্য ছিল না বলে এজাহারে তুলে ধরা হয়েছে।
অনুসন্ধানের বরাতে দুদক দাবি করেছে, ঋণ আবেদনের পক্ষে দাখিল করা ‘সাব-কন্ট্রাক্ট অ্যাগ্রিমেন্ট ভুয়া এবং জালিয়াতির’ মাধ্যমে তৈরি।
মামলা বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ডুয়েল গেজ রেললাইন প্রকল্প বাস্তবায়নের ‘সাব-কন্ট্রাক্ট’ হিসেবে যে চুক্তিপত্র দাখিল করা হয়েছিল, তাতে প্রকল্প পরিচালকের দপ্তরের একটি স্মারক (তারিখ: ২৯ মে ২০২৫) এবং সংশ্লিষ্ট পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন পর্যালোচনা ‘ভুয়া’ বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
দুদক বলছে, ঋণ আবেদন পাওয়ার পর শাখা পর্যায়ে যথাযথ যাচাই-বাছাই না করেই ঋণ প্রস্তাব প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। নীতিমালা অনুযায়ী ক্রেডিট কমিটিতে উপস্থাপন না করে দ্রুত বোর্ড মেমো তৈরি করে অনুমোদনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেছে দুদক।
ঋণ অনুমোদনের পর ‘ধাপে ধাপে বিতরণ’ বিতরণের শর্ত উপেক্ষা করে এককালীন বিতরণ করা হয়। ২০১৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর থেকে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র সাত দিনে ৫৯৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা গ্রাহকের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। পরে ২০২০ সালের ৬ জানুয়ারি ও ৮ মার্চ আরও ৩৫ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বিতরণ করা ৬০০ কোটি টাকার মধ্যে ৫২৫ কোটি টাকা ৩৭টি বেয়ারার চেকের মাধ্যমে নগদে উত্তোলন করা হয়। উত্তোলিত অর্থের একটি অংশ নগদ ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাবে পাঠানো হয়েছে।
আসামিদের মধ্যে ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক পর্যবেক্ষক।
অপর আসামিদের মধ্যে ব্লুম সাকসেস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ন্যাশনাল ব্যাংকের দিলকুশা শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের তৎকালীন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, ব্যাংকের সাবেক শীর্ষ নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সদস্য রয়েছেন।
এছাড়া কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির নামও এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাদের হিসাবে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ রয়েছে।
এই আসামিরা হলেন‒ব্লুম সাকসেস ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ জালাল খান মজলিশ ও পরিচালক খাদিজা আক্তার; ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও দিলকুশা শাখা ব্যবস্থাপক মো. হাবিবুর রহমান, সাবেক ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও ব্যবস্থাপক (অবসরপ্রাপ্ত) আরীফ মো. শহীদুল হক, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মোসতাক আহমেদ (ওরফে সি এম আহমেদ), সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ ওয়াদুদ, সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কোম্পানি সেক্রেটারি এ এস এম বুলবুল, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান (সিআরএম-১) আবু রাশেদ নওয়াব।
ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক ও বর্তমান পরিচালক মধ্যে আসামির তালিকায় আরও রয়েছেন মোয়াজ্জেম হোসেন, খলিলুর রহমান ও মাবরুর হোসেন।
এই তালিকায় আরও যাদের নাম এসেছে, তারা হলেন ক্রিস্টাল কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালাহ উদ্দীন খান মজলিশ ও পরিচালক আব্দুর রউফ; বেঙ্গল ও এম সার্ভিসেসের মালিক জন হক সিকদার; মেসার্স মাহবুব এন্টারপ্রাইজের মালিক সৈয়দ মাহবুব-ই-করিম; সিকোটেক হোল্ডিংস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান ও পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম; টেক ইনটেলিজেন্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জামিল হুসাইন মজুমদার; এম এস কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপার্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মাদ সালাহ উদ্দীন; জুপিটার বিজনেস শিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মমতাজুর রহমান ও জুপিটার বিজনেস লিমিটেডের পরিচালক মোসফেকুর রহমান, কৌশিক কান্তি।
—জা.অর্থনীতি/এনজে