৬ এনবিএফআইয়ের জিম্মি আমানত, ফেরতের দাবিতে ক্ষতিগ্রস্তদের

নিজস্ব প্রতিবেদক: অবসায়ন প্রক্রিয়ায় থাকা ৬টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) জিম্মি আমানত ফেরত পাওয়ার দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। 

‘অ্যালায়েন্স অব ৬ এনবিএফআই’স ডিপোজিটরস রিকভারি কমিটি’র ব্যানারে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আমানতকারীরা তাদের জমানো টাকা ফেরত পেতে সরকারি হস্তক্ষেপ ও দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আখতারি বেগম। তার স্বামী একেএম আনসার উদ্দিন ছিলেন বাপেক্সের (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড) একজন সাবেক কর্মকর্তা। অবসর জীবনের সঞ্চয় হিসেবে ১৬ লাখ টাকা জমা রেখেছিলেন ‘পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড’-এ। উদ্দেশ্য ছিল মেয়ের বিয়ে দেওয়া এবং নিজের বার্ধক্যকালীন চিকিৎসা। কিন্তু মেয়াদের শেষে টাকা তো দূরের কথা, মুনাফাও মেলেনি। চিকিৎসার অভাবে গত বছরের নভেম্বরে তার স্বামী মারা যান।

ভেঙে পড়া কণ্ঠে আখতারি বেগম জানান, আর্থিক সংকটের কারণে উৎসব ছাড়াই মেয়ের বিয়ে দিতে হয়েছে। এখন পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।

শুধুমাত্র আখতারি বেগম নন, অধ্যাপক ও নজরুল সংগীত শিল্পী নাসিদ কামালের সমন্বয়ে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে আরও অনেক ভুক্তভোগী তাদের কষ্টের কথা তুলে ধরেন। সঙ্গীতজ্ঞ মোস্তফা জামান আব্বাসীর মতো অনেক আমানতকারীই চিকিৎসার টাকা না পেয়ে ধুঁকে ধুঁকে মারা গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অব্যবস্থাপনা, দুর্বল তদারকি এবং খেলাপি ঋণের প্রভাবে ধসে পড়া ৬টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হলো:

১. ফাস ফাইন্যান্স, ২. প্রিমিয়ার লিজিং, ৩. ফারইস্ট ফাইন্যান্স, ৪. আভিভা ফাইন্যান্স, ৫. পিপলস লিজিং ও ৬ ইন্টারন্যাশনাল লিজিং।

দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ২ হাজার পরিবার এসব প্রতিষ্ঠানে টাকা আটকে থাকায় চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে। এমনকি খালেদ মনসুর ট্রাস্টের মতো দাতব্য প্রতিষ্ঠানের জমানো অর্থও আটকা পড়েছে, যা এতিম ও দুস্থদের সেবামূলক কাজে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করেছে।

আমানতকারীদের দাবি

১. আগামী ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে আমানত ফেরত পাওয়ার একটি স্বচ্ছ ও সময়বদ্ধ রূপরেখা ঘোষণা করতে হবে।

২. ব্যাংকিং খাতের মতো এনবিএফআই খাতেও আমানতকারীদের সমান সুরক্ষা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

৩. অবসায়ন ও অর্থ উদ্ধার প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখতে হবে।

৪. অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, “একজন আমানতকারী ব্যাংকে টাকা রাখুক বা এনবিএফআই-তে, তার টাকা নিরাপদ থাকার অধিকার সমান।”

চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ৩৫টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এই ৬টির আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল হওয়ায় অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। 

বর্তমান গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানিয়েছেন, আর্থিক খাতের সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং এই ছয়টি প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন প্রক্রিয়াও তার অংশ।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এখন সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন, অবিলম্বে তাদের জমানো টাকা ফেরত দিয়ে এই দুঃসহ যন্ত্রণা থেকে তাদের মুক্তি দেওয়ার।

—জা.অর্থনীতি/এনজে