হাওরে পানির নিচে স্বপ্নের বোরো ধান, শঙ্কায় লাখো কৃষক
আশরাফুল ইসলাম তুষার, কিশোরগঞ্জ: কিশোরগঞ্জের হাওরের এই সময়টা সাধারণত আনন্দের। দিগন্তজোড়া সোনালি ধান কাটার মৌসুম। কিন্তু এবার সেই সোনালি দৃশ্য নেই। অতিবৃষ্টির পানির তোড়ে ভাঙছে কৃষকের সোনালি ফসল ঘরে তোলার স্বপ্ন।

টানা বৃষ্টিতে অনেকাংশে ডুবে গেছে জেলার হাওর অঞ্চল। এতে ভেঙে গেছে লাখো কৃষকের স্বপ্ন। ফসলহানিতে হাওরপারের মানুষ এখন দিশেহারা। হাওরে এখন শুধুই হাহাকার। চোখের সামনে তলিয়ে যাচ্ছে সারা বছরের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ফসল।

ঠান্ডা ঝোড়ো হাওয়া, বজ্রপাত আতঙ্ক, ভারী বৃষ্টি- তবুও হাওরের দিকেই দৌড়াচ্ছেন কৃষক। হাঁটু থেকে বুক সমান পানিতে নেমে কেটে আনার চেষ্টা করছেন পরিবারের সারা বছরের খাদ্য জোগানোর ধান।

কিশোরগঞ্জের ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম ও নিকলী উপজেলার হাওরে বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুপুরে দেখা যায়, অষ্টগ্রাম উপজেলার আব্দুল্লাপুর গ্রামের কৃষক জলিল মিয়া বুক সমান পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছেন। 

তিনি বলেন, অর্ধেক কাটছি, কিন্তু কাটা ধান পচে যাচ্ছে। বাকি জমি ডুবে গেছে। কী করমু, বুঝতেছি না।

একই এলাকার কৃষক সালাম মিয়া বলেন, বজ্রপাতের আলোয় চোখ ঝাপসা হয়ে যায়, তবুও কেউ হাওর ছাড়ে না। ধান না তুললে পরিবার নিয়ে চলবো কীভাবে?

জেলার হাওরের প্রায় সব এলাকায় একই অবস্থা। কোথাও ধান কাটার শেষ চেষ্টা, কোথাও সব ছেড়ে দিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন কৃষক। টানা বৃষ্টিতে জেলার প্রায় সব হাওরের ফসল তলিয়ে গেছে।

গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে ফসলের মাঠ জলমগ্ন হলেও রাতের টানা বৃষ্টিতে ফসল তলিয়ে গেছে ফসল। গতকাল ও আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে কৃষকরা পানির নিচে কষ্টার্জিত ফসল দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

কৃষক শহীদ মিয়া বলেন, আমার সব শেষ হয়ে গেল, একমাত্র বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল আমার পরিবার। ধারদেনা করে জমি চাষাবাদ করেছিলাম, এখন সারাবছর কীভাবে চলব! তার ধারণা, কমপক্ষে দেড়-দুই হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে।

এদিকে সমস্যা শুধু ফসল ডুবে যাওয়া নয়। যে ধান কেটে আনা গেছে, সেটিও রক্ষা করা যাচ্ছে না। রোদ না থাকায় খলায় রাখা ধান পচে যাচ্ছে, অনেক জায়গায় ধানে চারা গজাতে শুরু করেছে।

কৃষক আলাল মিয়া নিকলী বরুলিয়া হাওরে ধান চাষ করেছিলেন। পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আগে তিনি অন্তত ৩০ মণ ধান মাড়াই ঝাড়াই করে সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে সেই ধান শুকাতে পারেননি তিনি।

পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করেছে বাঁধ ভাঙ্গনের আশঙ্কায়। স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছু করার নেই।

এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর আগেই ভারী বৃষ্টি ও ঢলের সতর্কতা দিয়েছিল। কৃষি বিভাগ পাকা ধান দ্রুত কেটে ফেলার পরামর্শ দেয়।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। শ্রমিক নেই, যন্ত্র কম, আবহাওয়া অনুকূলে নয়। ফলে অনেক কৃষক চাইলেও সময়মতো ধান তুলতে পারেননি। অনেক জায়গায় শ্রমিক সংকটের কারণে জমির মালিক স্ত্রী-সন্তানসহ নিজেই ধান কাটছেন।

জানা গেছে, কিশোরগঞ্জে প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে।

তবে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতি সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে জেলায় বোরো আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে। বিপরীতে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে।

এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৮১ হেক্টর এবং নন-হাওর এলাকায় ৬৩ হাজার ৬৮১ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৬৮৬ মেট্রিক টন চাল এবং ১১ লাখ ৯৫ হাজার ২৯ মেট্রিক টন ধান।

ধান কর্তনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও বেড়েছে। জেলার প্রায় ৭০ শতাংশ জমির ধান কম্বাইন হারভেস্টারের মাধ্যমে কাটা হচ্ছে। এ কাজে ৫৮০ থেকে ৬০০টি হারভেস্টার ব্যবহৃত হচ্ছে। বাকি ৩০ শতাংশ জমির ধান কাটছেন শ্রমিকরা।

কৃষক হরবজন দাস জানান, বর্তমান বাজারদরে ধান বিক্রি করলে প্রতি একরে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।

আরেক কৃষক জালাল উদ্দিন বলেন, “৬৭৫ টাকা দরে ২০০ মণ ধান বিক্রি করেছি। উৎপাদন খরচ তুলতেই কষ্ট হচ্ছে। প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়ছে প্রায় ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা। সরকার ১,৪৪০ টাকা দরে ধান কেনার ঘোষণা দিলেও সাধারণ কৃষকরা সেই সুবিধা পাচ্ছেন না।”

কৃষকদের দাবি, সরকার ঘোষিত মূল্য যেন প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছায়, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে কৃষকরা ধান চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন।

কিশোরগঞ্জের নিকলী আবহাওয়া অফিসের সিনিয়র অবজারভার আক্তার ফারুক জানান, বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুপুর ১২টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় সর্বোচ্চ ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের দিন মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টায় ২০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। আগামীকাল বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, এখনো হাওরের পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। তবে টানা বৃষ্টিতে পানি বাড়ছে। আগাম বন্যার হাত থেকে বাঁচতে ধান ৮০ শতাংশ পাকলেই কৃষকরা ধান কেটে ঘরে তুলতে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া ছিল।

কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, গতকাল পর্যন্ত জেলার হাওর এলাকায় ধান কাটা সম্পম্ন হয়েছে ৫১ শতাংশ। আজ দুপুর পর্যন্ত হাওরে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ২ হাজার ৩১ হেক্টর জমির ধান, যা ক্রমেই আরো বাড়তেসে।

তিনি আরও জানান, আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে আমরা গত কয়েকদিন ধরে কৃষকদের মাইংকিং করে ও মসজিদে মসজিদে বলে দিয়েছি- যেসব পাকা ধান অর্ধনিমজ্জিত আছে, সেগুলো ৮০ শতাংশ পাকলেই দ্রুত ধান কাটার জন্য।আমাদের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কৃষকদের দ্রুত পাকা ধান নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং ভুট্টা সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

—জা.অর্থনীতি/এনজে