শিল্প-ভোগ্যপণ্যের আমদানি কমে মন্দার পালে হাওয়া

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: চলমান বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে বেড়েছে পণ্য আমদানিতে জাহাজ ও কনটেইনার ভাড়া এবং বিমা প্রিমিয়াম। দেশের জ্বালানি তেল ও গ্যাসের লাগামহীন বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক ঋণ সংকোচন, নতুন বিনিয়োগে ভাটা, ভোক্তার চাহিদার অবনতি, ব্যয় সংকোচন নীতির কারণে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক। পাশাপাশি প্রতিযোগিতাহীন ভোগ্যপণ্যের বাজারের আমদানি কমার সঙ্গে কমেছে চাহিদাও যার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজারগুলোর ব্যবসা ও বাণিজ্য। গত কয়েক মাস ধরে ব্যবসায় মন্দাভাব চলছে। আর এই মন্দাভাবে পাইকারি বাজারের মোকাম, আড়ত ও দোকানগুলো আগে পণ্য পসরা ছিল দেখার মতো, সেখানে এখন পণ্য পসরা নেই বললেই চলে। দৈনিক কেনাবেচা কমেছে আগের চেয়েও ৩০ শতাংশেরও বেশি। একই অবস্থা ইস্পাত, সিমেন্ট ও অন্যান্য শিল্পপণ্যের বেলায়ও।

দেশের আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের প্রধান গেটওয়ে হলো চট্টগ্রাম বন্দর। এ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের (২০২৬-২৭) শুরু থেকেই বন্দরে মাসভিত্তিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং ধারাবাহিক কমছে। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৬০১ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হলেও আগস্টে তা কমে ২ লাখ ৮৫ হাজার ৪২৪ টিইইউতে নেমে আসে। সেপ্টেম্বরে হ্যান্ডলিং আরও কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ৭৯ হাজার ২৫৩ টিইইউতে। আর বিদায়ি অক্টোবর মাসে আরও কমেছে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৯০১ টিইইউ কনটেইনার। সবমিলিয়ে চলতি অর্থবছরের (২০২৬-২৭) চার মাসে ১১ লাখ ৪১ হাজার ১৭৯ টিইইউ কনটেইনার। শুধু মাসভিত্তিক নয়, আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায়ও বন্দরে সামগ্রিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং কমেছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ কম। অপরদিকে নিম্নগামী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের আমদানি পরিসংখ্যানেও।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ৯০ লাখ ৮৩ হাজার টন পণ্য শুল্কায়ন হয়েছিল যার মূল্য ছিল ৪৮ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। আর অক্টোবরে তা কমে দাঁড়ায় ৭৫ লাখ ৪৯ হাজার টনে এবং শুল্কায়িত মূল্য নেমে আসে ৪০ হাজার ৯১১ কোটি টাকায়। সে হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে শুল্কায়িত পণ্যের পরিমাণ প্রায় ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ এবং মূল্য ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। অপরদিকে গত বছরের একই (অক্টোবর) মাসে শুল্কায়িত পণ্যের পরিমাণ ছিল ৯১ লাখ ৬৫ হাজার টন এবং মূল্য ৪৫ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে শুল্কায়িত পণ্যের পরিমাণ প্রায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ এবং মূল্য ১০ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। শুল্কায়িত পণ্যের আমদানিতে বড় পতন দেখা গেছে।

আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা বলেন, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে হওয়ায় বড় বড় ও ভারী শিল্প গড়ে উঠেছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিল্প সম্প্রসারণ হয়নি। উল্টো নানা জটিলতায় গত এক দশকে চট্টগ্রামের ছোট ও বড় হাজার খানেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। আর যেসব প্রতিষ্ঠান চালু আছে তা কোনো রকমে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির এমন প্রবাহ থাকলে আমাদের ব্যবসা আরও সংকোচিত হবে। এর জন্য বেশ কয়েকটি কারণ আমরা লক্ষ্য করেছি। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ঋণ প্রদানে অনীহা দেখায়, জ্বালানি সংকট, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, শিল্পের জন্য জমি সংকট, নিয়ন্ত্রক সংস্থারগুলো ঢাকাকেন্দ্রিক নাগরিক সুবিধার অভাব প্রভৃতি। নতুন সরকারের উচিত এসব সংকটের সমাধান করে ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।

খাতুনগঞ্জ এলাকার গম আমদানিকারক আকসা ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ ফরিদুল আলম বলেন, পুরো বিশ্ব একটা সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। কখন পরিস্থিতি কী রূপ হতে পারে তা কারও ধারণায় নেই। ফলে ব্যবসায়ীরা পরিস্থিতি বোঝার জন্য আমদানি কমিয়েছে। এর মধ্যে যুদ্ধের কারণে ভোগ্যপণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়েছে যার প্রভাবে পড়েছে বাজারে। আবার দেশের জ্বালানি সংকট ও দাম বৃদ্ধির কারণে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতাও কমেছে। ফলে সবমিলিয়ে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসার অবস্থা ভালো না। 

চট্টগ্রাম চেম্বারের সিনিয়র সহ-সভাপতি ও রাইজিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচারক আমজাদ হোসাইন চৌধুরী জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, দেশে আমদানি ও রপ্তানিতে মন্দাভাব চলছে। এক দশক আগে তো ব্যবসায়ীরা চাহিদা অনুসারে গ্যাস সরবরাহ পায়নি। এ কারণে চট্টগ্রামে গত এক দশকে নতুন করে শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি। আর যেসব প্রতিষ্ঠান চালু আছে তারাও চাহিদা মতো গ্যাস সরবরাহ পাচ্ছে না। এ কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রাসারণ হয়নি। এছাড়া বিশ্বমন্দা, এলসি সংকট, ঋণ জটিলতায় অনেক প্রতিষ্ঠান আমদানি ও ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছে না।