এইচ এম হাসান আল মামুন লিমন
এক দিনের বক্তৃতায় নয়, সমবায়ীদের অধিকার, কৃষকের ন্যায্যমূল্য ও প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করেই প্রমাণ করতে হবে সমবায় উন্নয়নের অঙ্গীকার।
জাতীয় সমবায় দিবস এলেই সাজে মঞ্চ, উড়ে ব্যানার-ফেস্টুন, হয় র্যালি ও আলোচনা সভা। বক্তৃতায় উঠে আসে সমবায়ের গৌরব, কৃষকের উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি। কিন্তু দিবসের আলো নিভে গেলে সেই সমবায়ীরাই ফিরে যান পুরোনো সংকটে—কোথাও কর্মচারীর মাসের পর মাস বেতন বকেয়া, কোথাও সমিতির সম্পদ ও স্বায়ত্তশাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা, কোথাও কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নেই, আবার কোথাও ঋণ ও বাজারব্যবস্থার অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ছে সমবায় প্রতিষ্ঠান।
প্রশ্ন হলো, যে সমবায়ীদের ঘিরে এত আয়োজন, তাঁদের জীবন ও প্রতিষ্ঠানের সংকট সমাধানে সারা বছর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ কোথায়?
সমবায় দিবস কি কেবল আনুষ্ঠানিকতার উৎসব, নাকি সমবায়ীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জাতীয় অঙ্গীকার?
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষি উন্নয়নে সমবায়ের রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য এবং বিপুল সম্ভাবনা। দেশে প্রায় ৯০ হাজার কৃষক সমবায় সমিতি (কেএসএস), ৪৭৯টি উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি (ইউসিসিএ) এবং প্রায় এক কোটি সমবায়ীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করা গেলে কৃষি উৎপাদন, ঋণ, বিপণন, সংরক্ষণ ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানে সমবায় হতে পারে শক্তিশালী অর্থনৈতিক মাধ্যম। অথচ বাস্তবে সমবায়ের সম্ভাবনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ব্যবধান।
সমবায়ীদের প্রতিষ্ঠান, সিদ্ধান্ত কার হাতে?
ইউসিসিএ সমবায়ীদের মালিকানাধীন ও সদস্যদের অংশগ্রহণে পরিচালিত স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, দাপ্তরিক জটিলতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সীমাবদ্ধতা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সমবায়ীদের অর্থ ও উদ্যোগে গড়ে ওঠা জমি, ভবন, মূলধন এবং অন্যান্য সম্পদের সুরক্ষা নিয়েও বিভিন্ন স্থানে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে।
সমবায় আইন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যপরিধির মধ্যে সমন্বয়হীনতা থাকলে তার দায় শেষ পর্যন্ত সমবায়ীদেরই বহন করতে হয়।
মাঠপর্যায়ে তদারকি, নিবন্ধন, নির্বাচন, নিরীক্ষা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনিক সহায়তা কখনোই সমবায়ীদের বৈধ মালিকানা ও গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার হাতিয়ার হতে পারে না।
কর্মচারীর বেতন অনিশ্চিত, প্রতিষ্ঠান হবে কীভাবে স্বনির্ভর?
দেশের অনেক ইউসিসিএ কর্মচারী নিয়মিত বেতন-ভাতা, বকেয়া পাওনা, চাকরির নিরাপত্তা ও অবসরকালীন সুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। একটি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ কর্মচারীরা যখন জীবিকা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন, তখন সেখান থেকে দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও সেবার প্রত্যাশা করা কঠিন। কর্মচারীদের বিদ্যমান অধিকার ও সুযোগ সংকুচিত করে নয়, বরং আয়বর্ধক কার্যক্রম, ন্যায্য চাকরিবিধি এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল করতে হবে।
ফসল ফলান কৃষক, মুনাফা যায় মধ্যস্বত্বভোগীর পকেটে
কৃষকের সংকট শুধু উৎপাদন খরচে সীমাবদ্ধ নয়। সংরক্ষণাগার, হিমাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারে সরাসরি প্রবেশাধিকারের অভাবে কৃষক অনেক সময় বাধ্য হয়ে কম দামে ফসল বিক্রি করেন। অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগীরা বাজারের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। সমবায়ভিত্তিক অটো রাইস মিল, আধুনিক শস্য সংরক্ষণাগার, কৃষিপণ্য বিপণন কেন্দ্র এবং সরাসরি বাজারসংযোগ গড়ে তোলা গেলে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বাস্তব সুযোগ তৈরি হবে। এ ক্ষেত্রে ইউসিসিএ ও কেএসএসকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মসূচি, কৃষিঋণ এবং বাজারব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা জরুরি।
এখন প্রয়োজন ঘোষণার নয়, বাস্তবায়নের
সমবায় খাতের সংকট সমাধানে সরকারের কাছে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি ও করণীয় সামনে আনা প্রয়োজন। প্রথমত, ইউসিসিএ ও কেএসএসের আর্থিক অবস্থা, সম্পদ, জনবল ও প্রশাসনিক সমস্যার ওপর সময়সীমাবদ্ধ নিরপেক্ষ পর্যালোচনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সমবায়ীদের মালিকানা, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আইনসম্মত ক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠানের সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ইউসিসিএ কর্মচারীদের বকেয়া বেতন ও নিয়মিত বেতন-ভাতার জন্য বিশেষ সহায়তা তহবিল গঠন করতে হবে। চতুর্থত, প্রতিটি ইউসিসিএর জন্য আয়বর্ধক ও স্বনির্ভরতার রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। পঞ্চমত, কৃষিঋণ, হিমাগার, অটো রাইস মিল, বীজ সংরক্ষণ ও কৃষিপণ্য বিপণনে সমবায়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল হিসাবব্যবস্থা, স্বচ্ছ নিরীক্ষা, নিয়মিত নির্বাচন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ড. আখতার হামিদ খান সমবায়কে পল্লী উন্নয়নের শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই দর্শনকে বর্তমান বাস্তবতায় কার্যকর করতে হলে সমবায়কে প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও বাজারমুখী করতে হবে। শুধু দিবসের মঞ্চে সমবায়ের প্রশংসা করলে চলবে না; সমবায়ীদের সমস্যা সমাধানে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে।
সমবায় কোনো দপ্তরের প্রকল্প নয়; এটি মানুষের সম্মিলিত মালিকানা, অংশগ্রহণ ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতিষ্ঠান। তাই জাতীয় সমবায় দিবসের প্রকৃত সার্থকতা হবে তখনই, যখন এক দিনের আয়োজনের পরিবর্তে সারা বছরের রাষ্ট্রীয় কর্মপরিকল্পনায় সমবায়ীরা অগ্রাধিকার পাবেন। সমবায় বাঁচলে কৃষক বাঁচবে, কৃষক বাঁচলে শক্তিশালী হবে গ্রামীণ অর্থনীতি—এই সত্য উপলব্ধি করার সময় এখনই।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় পল্লী উন্নয়ন সমবায় ফেডারেশন
[email protected]
