সামছুল ইসলাম: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো ব্যবসায়িক দোকান নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারখানা। এখানে শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করা হয় না, বরং একটি শিশুর চিন্তাভাবনা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও জীবনবোধ গড়ে ওঠে। অথচ আমাদের দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অনেক সময় শিক্ষার মান ও সামাজিক দায়বদ্ধতার চেয়ে আর্থিক লাভের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, যোগ্য শিক্ষক, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও যথাযথ তদারকি ছাড়াই মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। ফলে শিক্ষার নামে একধরনের বাণিজ্যিক প্রবণতা বিস্তার লাভ করছে, যা উদ্বেগজনক।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা অবশ্যই একটি মহৎ উদ্যোগ। প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, ঝরে পড়া রোধ এবং শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করার ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগের ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে যেখানে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যাপ্ত নয়, সেখানে নতুন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু প্রয়োজনের সঙ্গে মানের সমন্বয় না ঘটলে শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়িয়ে শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। বরং অপরিকল্পিতভাবে প্রতিষ্ঠান বাড়লে শিক্ষার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক প্রতিষ্ঠান চালুর আগে শিক্ষার পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সক্ষমতা যাচাই করা হয় না। কোথাও পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই, কোথাও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নেই, আবার কোথাও শিশুদের জন্য নিরাপদ স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ পানি কিংবা উপযুক্ত খেলার জায়গারও অভাব রয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন নামে অর্থ আদায় করা হলেও সেই অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয় না। অভিভাবকেরা সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে অর্থ ব্যয় করেন। কিন্তু তাঁদের সেই আস্থার যথাযথ প্রতিদান কতটুকু মিলছে, তা দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
এখানে ধর্মীয় শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষার মধ্যে বিভাজন টানার কোনো সুযোগ নেই। মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন, প্রাথমিক বিদ্যালয় কিংবা অন্য যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত শিক্ষার মান, শিক্ষকের যোগ্যতা, শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা এবং নৈতিক পরিবেশ। একটি মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সাধারণ জ্ঞানের চর্চা থাকতে হবে। একইভাবে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের বিকাশ ঘটাতে হবে। শিক্ষার ধরন ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য থাকা উচিত নয়।
শিশুদের আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে শিক্ষার্থীদের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার, পরিচ্ছন্ন আবাসন, চিকিৎসাসেবা এবং দায়িত্বশীল তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার পর তদন্ত কিংবা ব্যবস্থা গ্রহণের চেয়ে আগাম সতর্কতা ও নিয়মিত পরিদর্শন অনেক বেশি কার্যকর। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়েও কঠোর নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।
এ অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমোদন ও নিবন্ধনপ্রক্রিয়া আরও কার্যকর করা জরুরি। প্রতিষ্ঠান চালুর আগে জমি, ভবন, শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষকসংখ্যা, শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই করতে হবে। অনুমোদন দেওয়ার পর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; নিয়মিত পরিদর্শন, শিক্ষার মান মূল্যায়ন এবং অভিভাবকদের মতামত গ্রহণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান শর্ত পূরণে ব্যর্থ হবে, তাদের প্রয়োজনীয় সময় দিয়ে সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে। গুরুতর অনিয়ম ও শিশুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে শিক্ষকদের মর্যাদা, প্রশিক্ষণ ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে হবে। কারণ যোগ্য ও দায়িত্বশীল শিক্ষক ছাড়া মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করা দরকার। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের বিপরীতে কী ধরনের শিক্ষা ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, তার হিসাব অভিভাবকদের কাছে পরিষ্কার থাকা উচিত।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা, ভবনের আকার কিংবা প্রচারণার জৌলুশ দিয়ে নির্ধারিত হয় না; নির্ধারিত হয় শিক্ষার্থীরা কতটা জ্ঞানী, দক্ষ, মানবিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠছে, তার ভিত্তিতে। তাই যত্রতত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রতিযোগিতা বন্ধ করে প্রয়োজন, সক্ষমতা ও মানদণ্ড বিবেচনায় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, পরিচালনা পর্ষদ এবং অভিভাবকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সংখ্যার আধিক্য নয়, শিক্ষার উৎকর্ষই হোক আমাদের লক্ষ্য। কারণ আজকের শিশুরাই আগামী দিনের রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনা করবে। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো ধরনের বাণিজ্যিক অবহেলা কিংবা দায়িত্বহীনতার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
সহকারী শিক্ষক, চরশাহী ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা
চন্দ্রগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর ৩৭০৮
