রপ্তানি কমেছে বাংলাদেশের, এগিয়ে ভিয়েতনাম-কম্বোডিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ। তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমেছে ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাজারের গড় পতনের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি কমেছে কম হারে। অন্যদিকে এ সময়ে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বস্ত্র ও পোশাকবিষয়ক দপ্তরের (ওটেক্সা) সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এই তথ্য পাওয়া গেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৬১৩ কোটি ৫৪ লাখ ৭০ হাজার ডলারের পোশাক আমদানি করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৬৪২ কোটি ৯১ লাখ ২০ হাজার ডলার। সেই হিসাবে বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ২৯ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার।

অন্যদিকে চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে যুক্তরাষ্ট্র মোট ৫ হাজার ৬৬৭ কোটি ৭৬ লাখ ৪০ হাজার ডলারের পোশাক আমদানি করেছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ৬ হাজার ৩৮ কোটি ৩২ লাখ ২০ হাজার ডলার। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশটির পোশাক আমদানি কমেছে ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। সে তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি হ্রাসের হার ১ দশমিক ৫৭ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সামগ্রিক চাহিদা সংকুচিত হলেও বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলক ভালো।  

প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে কম্বোডিয়া। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরে দেশটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি বেড়েছে ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়া থেকে ২ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং ভিয়েতনাম থেকে বেড়েছে শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ। বিপরীতে চীন থেকে আমদানি কমেছে ২৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, ভারত থেকে ২৫ দশমিক ১৯ এবং পাকিস্তান থেকে ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চীন, ভারতের মতো বড় সরবরাহকারী দেশগুলোর রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে কমলেও বাংলাদেশের ক্ষতি হয়েছে তুলনামূলক কম। তবে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের ওপর প্রতিযোগিতার চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে কম্বোডিয়ার ধারাবাহিক অগ্রগতি বাংলাদেশের জন্য নতুন করে প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের বাজার হিস্যা সামান্য কমেছে। ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে দেশটির মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ছিল ১০ দশমিক ৯৯ শতাংশ। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে ১০ দশমিক ৮৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের বাজার হিস্যা কমেছে শূন্য দশমিক ১৬ শতাংশীয় পয়েন্ট।

রপ্তানির আর্থিক মূল্যের পাশাপাশি পরিমাণের হিসাবেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে। ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ৯ মাসে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৯৫ দশমিক ৬১ মিলিয়ন স্কয়ার মিটার ইকুইভ্যালেন্ট (এসএমই), যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৭১ দশমিক ২৪ মিলিয়ন এসএমই। ফলে রপ্তানি কমেছে ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। তবে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমেছে ৮ দশমিক ১০ শতাংশ। অর্থাৎ পরিমাণের দিক থেকেও বাংলাদেশের পতন বাজারের গড় পতনের তুলনায় কম।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য বেড়েছে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরে বিশ্ববাজার থেকে আমদানি করা প্রতি এসএমই পোশাকের গড় মূল্য ছিল ৩ দশমিক ১২ ডলার। চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে ৩ দশমিক ১৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ১৪ শতাংশ।

তবে বাংলাদেশের পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য কমেছে। ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য ছিল ৩ দশমিক ১০ ডলার। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে ৩ দশমিক ০৭ ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ এক বছরে বাংলাদেশের পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য কমেছে শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ। বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কম। অথচ এক বছর আগেও বাংলাদেশের পোশাকের গড় মূল্য বৈশ্বিক গড়ের কাছাকাছি ছিল।

এশিয়ার প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর গড় ইউনিট মূল্য বিশ্লেষণেও ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। সাতটি প্রধান সরবরাহকারী দেশের মধ্যে পাঁচটির পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য কমেছে। চীনের ক্ষেত্রে এই পতন সর্বোচ্চ, ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ার কমেছে ৩ দশমিক ৫২ শতাংশ, ভারতের ১ দশমিক ৮৮, পাকিস্তানের ১ দশমিক ৩৩ এবং বাংলাদেশের শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ। বিপরীতে ভিয়েতনামের পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য বেড়েছে ১ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার শূন্য দশমিক ৫২ শতাংশ।

এছাড়া মেক্সিকো ও হন্ডুরাসের গড় ইউনিট মূল্য যথাক্রমে ১৬ দশমিক ১৫ শতাংশ ও ৭ দশমিক ৮২ শতাংশ বেড়েছে। তবে এ সময়ে দেশ দুটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির আর্থিক মূল্য যথাক্রমে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ ও ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ কমেছে। এতে বোঝা যায়, রপ্তানির আর্থিক মূল্য ও গড় ইউনিট মূল্যের পরিবর্তন সব দেশের ক্ষেত্রে একই ধারায় ঘটেনি।

মাসভিত্তিক হিসাবেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে ওঠানামা দেখা গেছে। চলতি বছরের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই মাসের চেয়ে ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ বেড়েছিল। তবে সেপ্টেম্বরে তা ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ কমে যায়। ফলে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে।


সামগ্রিক পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক বাজারে চাহিদা কমার মধ্যেও বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে কম হারে রপ্তানি হারিয়েছে। চীন ও ভারতের মতো বড় সরবরাহকারী দেশগুলোর রপ্তানিতে বড় পতন বাংলাদেশের জন্য বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পণ্যের মান, বৈচিত্র্য ও মূল্য সংযোজনে এগিয়ে থাকতে হবে।