অ্যান কারসন: ভাষার সীমা ছাড়িয়ে এক অনন্য সাহিত্যজগৎ

সানজিদ সকাল: নানা সাহিত্যধারার মেলবন্ধনের মাধ্যমে সমকালীন সাহিত্যের নতুন রূপ তৈরি করে নোবেল পুরস্কার পেলেন অ্যান কারসন। অ্যান কারসন একাধারে ধ্রুপদি সাহিত্যের অধ্যাপক এবং প্রাচীন ভাষা, সাহিত্য, নৃবিজ্ঞান ও ইতিহাসের পণ্ডিত। সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী হিসেবে কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও ধ্রুপদি সাহিত্যের পণ্ডিত অ্যান কারসনের নাম ঘোষণা করে সুইডিশ একাডেমি। ভালোবাসা, কামনা ও হতাশা নিয়ে লেখা সাহিত্যকর্মগুলোতে তিনি প্রাচীন ঐতিহ্য ও রহস্যবাদের সঙ্গে আধুনিকতার চমৎকার মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।


অ্যান কারসনের সাহিত্যকর্ম নিয়ে লেখা কঠিন ব্যাপার। কাজটি অসম্ভব বটে— যেমন অসম্ভব শূন্যকে শূন্য দিয়ে ভাগ করার গাণিতিক সমস্যার সমাধান করা। কেউ যদি সেই সমস্যার সমাধান করতে পারতেন, তাহলে হয়তো অ্যান কারসনের সাহিত্যকর্ম নিয়ে লেখার সাহসও তার হতো। লিখতে গিয়ে চরম পরিস্থিতিতে সব শব্দই অর্থ প্রকাশে ব্যর্থ হয়। এর মধ্যে যেমন রয়েছে এমন কিছু অপূরণীয় ক্ষতি, যা কোনোভাবেই উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। 

শুরু করা যেতে পারে কারসনের নিজের লেখা দিয়েই। অটোবায়োগ্রাফি অব রেড বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‘শব্দকে যদি তাদের মতো করে থাকতে দাও, তাহলে তারা যা করতে চায় এবং যা করা তাদের প্রয়োজন, তা-ই করবে।’ কিন্তু শব্দকে তাদের নিজস্ব আকাঙ্ক্ষা, ব্যাকুলতা, হতাশা ও বিভ্রান্তি নিয়ে বাঁচতে দেওয়া; তাদের দিয়ে এমন এক অসহনীয় যন্ত্রণা চিৎকার করে প্রকাশ করানো, যা ভাষায় ধরা অসম্ভব; কিংবা চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক নিয়ে তাদের দিয়ে কোনো ধাঁধা বলানো, অথবা শব্দে-শব্দে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলতে দেওয়া— এমন শব্দ সাধনায় আমাদের মধ্যে কজনই বা সিদ্ধহস্ত হতে পেরেছি?

কিন্তু না, এখানে ‘সিদ্ধহস্ত’ বা ‘মালিক’ হওয়ার ধারণাটিই ভুল। কেবল অল্প প্রতিভার, লোভী ও ক্ষমতালিপ্সু লেখকেরাই শব্দের মালিক হতে চান। অ্যান কারসন তার শব্দগুলোকে বশ মানান না, নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনাও করেন না। তিনি তাদের স্বাধীনভাবে থাকতে দেন; বরং শব্দের হাত ধরেই নিজে এগিয়ে যান। তার নিজের শব্দের পাশাপাশি প্রাচীন লেখকদের রচনাও তাকে পথ দেখায়, যেগুলো তিনি অনুবাদের মাধ্যমে এমন অসাধারণ ইংরেজিতে রূপ দিয়েছেন যে সেগুলো ভোলার নয়।

আর কী অসাধারণ সেই শব্দগুলো! ধরা যাক, আমরা যদি কল্পনা করি, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই যেন কিছু শব্দের সমন্বয়ে গঠিত একেকটি রূপ— কেউ একটি কবিতা, কেউ গল্প, নাটক কিংবা উপন্যাস; কেউ আন্তরিক অথচ চিন্তায় তালগোল পাকানো মতামতধর্মী নিবন্ধ, কেউ উচ্চকণ্ঠ স্লোগান, কেউবা বারবার ব্যবহারে ক্লান্তিকর হয়ে ওঠা কোনো গতানুগতিক বাক্য। আবার কেউ হয়তো কেবল কয়েকটি অসমাপ্ত বিন্দুর সারি, কিংবা এক টুকরো শূন্য সাদা জায়গা। এই কল্পনার খেলায় শব্দকে অন্তর্ভুক্ত করলে যতিচিহ্ন ও নীরবতাকেও বাদ দেওয়া চলে না।

এমন অসংখ্য শব্দনির্মিত সত্তার সমাবেশে অ্যান কারসনের সৃষ্টিগুলোকে সহজেই আলাদা করে চেনা যাবে। তার সাহিত্যকর্মের অস্তিত্বই এক বিস্ময়, কারণ সেগুলোকে সম্ভব করে তুলতে প্রচলিত বহু নিয়ম বাঁকাতে হয়েছে, কোনো কোনো নিয়ম ভেঙেও ফেলতে হয়েছে। তবু তার রচনাগুলো নৈরাজ্যবাদী কিংবা বিপ্লবী নয়। সেগুলো একই সঙ্গে মরণশীল ও অমর, কারণ তারা জানে কোন বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‘ভালোবাসা শর্তসাপেক্ষ নয়। কিন্তু বেঁচে থাকা অনেক শর্তের ওপর নির্ভরশীল।’

তার রচনাগুলো আমাদের টানে, কারণ সেগুলোর মধ্যেও রয়েছে এক অনিবার্য টান। কারসনের অনুবাদে ইউরিপিদিসের ইলেক্ট্রা নাটকে আমরা পড়ি, ‘আমি জানি,/আমার শোককে তোমার/অসহনীয় মনে হয়।/আমি তা বড় কঠিনভাবে বহন করি।/কিন্তু তোমাকে বলছি, আমার কোনো বিকল্প নেই।/এই শোক আমাকে বাধ্য করে।/এর তাড়নাতেই আমি কাজ করি।’ তার রচনাগুলো নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্বে অটল, আপসহীন। ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’ গ্রন্থে কারসন লিখেছেন, ‘যা জানা হয়ে গেছে, অর্জিত হয়েছে, অধিকারে এসেছে, তা আর আকাঙ্ক্ষার বস্তু থাকে না।’

অ্যান কারসনের সৃষ্টির সংস্পর্শ আমাদের মনকে প্রসারিত করে, চিন্তাকে গভীর করে, কখনও রহস্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়, আবার কখনও আমাদের উপলব্ধিকে স্বচ্ছ করে তোলে। তার একটি অনুচ্ছেদই যথেষ্ট, আমাদের নিয়ে যেতে পারে এমন এক অনাবিষ্কৃত ভূখণ্ডে, যেখানে আমরা দীর্ঘক্ষণ পথ হারিয়ে ঘুরে বেড়াতে চাই। তার একটি পঙ্‌ক্তিই যথেষ্ট নিজের সম্পর্কে আরও গভীরভাবে বুঝতে শেখার জন্য।

আমি মাঝে-মধ্যে শিক্ষার্থীদের অ্যান কারসনের লেখা পড়াই। কিন্তু অ্যান কারসনকে পড়ানো যায়— এমন কথা বলাটাও এক অর্থে হাস্যকর। আসলে তার রচনা পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই। এই বিশ্বাসে যে, তাদের মধ্যেও এমন কিছু মানুষ নিশ্চয়ই থাকবে, যারা তার সঙ্গে আত্মিকভাবে সংযোগ অনুভব করবে। গত ২০ বছর ধরে আমি এ কাজই করে আসছি। তরুণ, অনুসন্ধিৎসু মন প্রথমবারের মতো অ্যান কারসনের সাহিত্যজগতের মুখোমুখি হলে তাদের প্রতিক্রিয়া দেখতে আমার ভালো লাগে। তাদের কেউ কেউ আমার মতোই আজীবন তার পাঠক হয়ে থাকবে। কেউ কেউ জীবনের চরম সংকটের মুহূর্তে তার লেখাকেই খুঁজে নেবে নিজের পড়ার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে।

অসীমকে অসীম দিয়ে ভাগ করলে কী হয়? কিংবা অসীম থেকে অসীম বিয়োগ করলে? অথবা শূন্যকে অসীম দিয়ে গুণ করলে? কারসনের লেখা পড়লে জীবনের দিকে তাকানোর এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়; এমন এক জীবনে বেঁচে থাকার সাহসও জাগে, যে জীবনকে প্রায়ই ব্যাখ্যা করা যায় না, যার অনেক কিছুরই কোনো বোধগম্য অর্থ খুঁজে পাওয়া কঠিন।

অ্যান কারসন নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন— এ খবর সত্যিই আনন্দের। কখনও কখনও এমন সুসংবাদ আসে, যাকে যথার্থ ও ন্যায়সংগত বলেই মনে হয়। যদিও বিষয়টি ততটাই সরল, যতটা সরল একের সঙ্গে এক যোগ করলে দুই হয়— এ কথা জানা। এই স্বীকৃতি অ্যান কারসনের প্রতিভার অসীমত্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। কিন্তু তার প্রতিভার গভীরতা উপলব্ধি করতে হলে খুব বেশি কিছু করার প্রয়োজন নেই। তার যেকোনো একটি বইয়ের যেকোনো একটি পৃষ্ঠা খুলে পড়তে শুরু করলেই যথেষ্ট।