কম ঘুমের বিজ্ঞান: স্বাস্থ্যঝুঁকি নাকি বিশেষ ক্ষমতা?

অনলাইন ডেস্ক: একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সাধারণত দৈনিক সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হলেও কিছু মানুষ মাত্র চার-পাঁচ ঘণ্টা ঘুমিয়েই সম্পূর্ণ সুস্থ ও সতেজ থাকেন। বিজ্ঞানীদের মতে, এই বিশেষ ক্ষমতার পেছনে রয়েছে ‘ফ্যামিলিয়াল ন্যাচারাল শর্ট স্লিপ’ (এফএনএসএস) নামক এক ধরনের জিনগত বৈশিষ্ট্য। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার এক গবেষণায় দেখা যায়, এই জিনগত পরিবর্তন থাকা ব্যক্তিরা রাতে স্বাভাবিক সময়ে ঘুমাতে গেলেও খুব ভোরে প্রাকৃতিকভাবেই তাদের ঘুম ভেঙে যায়। ফলে মাত্র চার থেকে সাড়ে ছয় ঘণ্টা ঘুমিয়েই তারা কোনো ধরনের ক্লান্তি বা মনোযোগের ঘাটতি ছাড়াই দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে নিতে পারেন।

এই জিনগত বৈশিষ্ট্যের প্রভাব নিয়ে মানুষ ও প্রাণী উভয় ক্ষেত্রেই বিস্তারিত প্রমাণ পাওয়া গেছে। ইঁদুরের ওপর করা পরীক্ষায় দেখা গেছে, এফএনএসএস জিন থাকা ইঁদুর কম ঘুমালেও তাদের স্মৃতিশক্তিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না, বরং এটি আলঝেইমারের মতো রোগ থেকেও সুরক্ষা দিতে পারে। ২০১৪ সালে ১০০ জোড়া যমজ মানুষের ওপর করা অপর এক গবেষণায় বিএইচএলএইচই৪১ (ডিইসি২) জিনের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। ওই গবেষণায় দেখা যায়, জিনগত পরিবর্তন থাকা একজন ব্যক্তি গড়ে পাঁচ ঘণ্টা ঘুমিয়েও টানা ৩৮ ঘণ্টা জাগরণের পর তার ভাইয়ের তুলনায় (যিনি ৬ ঘণ্টার বেশি ঘুমাতেন) ৪০ শতাংশ কম মনোযোগ হারিয়েছেন। এর মূল কারণ হলো, ঘুমের মোট সময় কম হলেও তাদের গভীর ঘুমের পরিমাণ স্বাভাবিক থাকে, যা শরীর ও মস্তিষ্ককে পরিপূর্ণ বিশ্রাম দেয়।

তবে ঘুমের সময়কাল নির্ধারণে কেবল একটি বা দুটি নয়, বরং অসংখ্য জিনের সম্মিলিত ভূমিকা রয়েছে। সম্প্রতি কিংস কলেজ লন্ডনের এক গবেষণায় প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত ২৩৪টি স্বতন্ত্র জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি জিনের প্রভাব অত্যন্ত সামান্য হলেও সম্মিলিতভাবে এগুলো ঘুমের সময়ের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। তবে বিবিসি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, কম ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত এসব জিনগত বৈশিষ্ট্য অনেক ক্ষেত্রে অনিদ্রা, ক্লান্তি, এডিএইচডি, বিষণ্নতা এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে।

কম ঘুম নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের এক ধরনের ভুল ধারণাও কাজ করে। ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ যখন প্রতিনিয়ত চার থেকে ছয় ঘণ্টা ঘুমান, তখন সময়ের সঙ্গে তাদের চিন্তাশক্তি ও কর্মক্ষমতা কমতে থাকে, কিন্তু তারা নিজেরা এই অবনতি বুঝতে পারেন না। সত্যিকার অর্থে কারা জিনগত কারণে কম ঘুমিয়েও সুস্থ থাকছেন আর কারা নিজেদের অজান্তেই ক্ষতির শিকার হচ্ছেন, তা ভবিষ্যতে জিনগত গবেষণার মাধ্যমেই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। বিজ্ঞানীদের প্রত্যাশা, এসব জিনের কার্যপদ্ধতি পুরোপুরি উদ্ঘাটন করা গেলে ভবিষ্যতে ঘুমের সমস্যার চিকিৎসায় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কর্মক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কার্যকর ওষুধ তৈরি করা সম্ভব হবে।
জেএ/অভি