রান্নাঘরের আগুনে অর্থনীতির উত্তাপ এলপিজি বাজারের সংকট ও সম্ভাবনা

শেখ মাজেদুল হক: ধরা যাক, রংপুরের একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের রান্নার গ্যাস মাসের শেষ দিকে ফুরিয়ে গেল। নতুন সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে পরিবারের সদস্য জানতে পারলেন দাম আবার বেড়েছে। কোথাও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা চাওয়া হচ্ছে। সংসারের সীমিত বাজেটে নতুন করে হিসাব মেলাতে হচ্ছে। প্রয়োজনে আবারও ফিরতে হচ্ছে লাকড়ি কিংবা কেরোসিনের পুরোনো ব্যবস্থায়।

ঘটনাটি একটি পরিবারের হলেও এর পেছনের সংকট অনেক বড়। কারণ, একটি এলপিজি সিলিন্ডার আমাদের রান্নাঘরে পৌঁছানোর আগে পেরিয়ে আসে আন্তর্জাতিক বাজার, বৈদেশিক মুদ্রা, ব্যাংকের ঋণপত্র, সমুদ্রপথে পরিবহন, আমদানি, সংরক্ষণ, বোতলজাতকরণ, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রির দীর্ঘ সরবরাহব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার যেকোনো একটি পর্যায়ে সমস্যা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে সরাসরি ভোক্তার চুলায়।

আট মাসে ৭১৯ টাকা: মূল্যবৃদ্ধির অস্বস্তিকর চিত্র
এলপিজির দাম বৃদ্ধির সাম্প্রতিক চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ২০২৬ সালের মার্চে ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৮৫ টাকায়। অক্টোবরে আরও ২৫২ টাকা বেড়ে হয় ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। সর্বশেষ নভেম্বর মাসে আরও ২২৩ টাকা বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৬০ টাকা। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসে সেপ্টেম্বরের তুলনায় দাম বেড়েছে ৪৭৫ টাকা। আর মার্চ থেকে নভেম্বর—এই আট মাসে বেড়েছে ৭১৯ টাকা যা প্রায় ৫৩ দশমিক ৬ শতাংশ। বিশেষ করে অক্টোবর ও নভেম্বর—পর পর দুই মাসে মোট ৪৭৫ টাকা বৃদ্ধি সাধারণ ভোক্তার ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে।

মূল্যবৃদ্ধির ধারাবাহিক চিত্রটি  তুলে ধরা হলো:
সময়কাল    দাম বৃদ্ধি    ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম
মার্চ, ২০২৬    —    ১,৩৪১ টাকা
সেপ্টেম্বর, ২০২৬    ২৪৪ টাকা    ১,৫৮৫ টাকা
অক্টোবর, ২০২৬    ২৫২ টাকা    ১,৮৩৭ টাকা
নভেম্বর, ২০২৬    ২২৩ টাকা    ২,০৬০ টাকা
এই পরিসংখ্যান শুধু একটি পণ্যের দাম বাড়ার হিসাব নয়; এটি সাধারণ পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিরও প্রতিচ্ছবি। যেসব পরিবার নিয়মিত এলপিজি ব্যবহার করে তাদের মাসিক ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন রান্নার জ্বালানির পেছনে চলে যাচ্ছে। আয় না বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ছে। ফলে খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় সংকোচন করতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।

আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব কতটা?
এলপিজির মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় পুরোটাই আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি আরামের ঘোষিত কন্ট্রাক্ট প্রাইস বা সৌদি সিপি, জাহাজভাড়া, আমদানিসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয় এবং ডলারের বিনিময় হার—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় বাজারে দাম নির্ধারণ করা হয়।

অক্টোবরের মূল্যবৃদ্ধির কারণ বিশ্লেষণ করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) হিসাব অনুযায়ী, সৌদি সিপির গড় মূল্য টনপ্রতি ৬৪৭ দশমিক ৭৫ ডলার থেকে বেড়ে ৭১২ দশমিক ৫০ ডলার হয়েছিল। একই সময়ে জাহাজভাড়া ও ব্যবসায়ীদের প্রিমিয়াম টনপ্রতি ১৬০ ডলার থেকে বেড়ে ২৫০ ডলারে দাঁড়ায়। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মূল্যের পাশাপাশি পরিবহন ও আমদানিসংশ্লিষ্ট ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। এই দুই খাতের মোট বৃদ্ধির মধ্যে জাহাজভাড়া ও প্রিমিয়ামের অংশ ছিল প্রায় ৫৮ শতাংশ। অন্যদিকে ডলারের বিনিময় হার সেপ্টেম্বরের ১২৩ দশমিক ৩০ টাকা থেকে অক্টোবরে ১২৩ দশমিক ১৮ টাকা হওয়ায় এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ছিল না। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে তার প্রভাব স্থানীয় বাজারে পড়বে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রভাব কতটা যৌক্তিক, পরিবহন ও আমদানি ব্যয়ের হিসাব কতটা স্বচ্ছ এবং ভোক্তার ওপর কতটুকু চাপ দেওয়া হচ্ছে সেগুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

দামের ওঠানামা ও ভোক্তার আস্থার সংকট
এলপিজির দাম শুধু বাড়ছে না, কয়েক মাসের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্যভাবে ওঠানামাও করছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে দুই দফায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৫৯৯ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকায় উঠেছিল। পরে জুন ও জুলাইয়ে মোট ৪১২ টাকা কমে দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৫২৮ টাকা। আগস্টে আবার ৭০ টাকা বৃদ্ধি পায়। সেপ্টেম্বরে ১৩ টাকা কমলেও অক্টোবরে ২৫২ টাকা এবং নভেম্বরে আরও ২২৩ টাকা বেড়েছে।

এই অস্থিরতা পরিবারের মাসিক বাজেট পরিকল্পনাকে কঠিন করে তুলছে। বিপণন শাস্ত্রে ভোক্তার একটি নির্দিষ্ট পণ্যের প্রতি মূল্য-প্রত্যাশা বা রেফারেন্স প্রাইস থাকে। অর্থাৎ ক্রেতা সাধারণত আগের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একটি পণ্যের গ্রহণযোগ্য দাম সম্পর্কে ধারণা তৈরি করেন। কিন্তু একই পণ্যের দাম যখন অল্প সময়ের মধ্যে বারবার বাড়ে-কমে, তখন সেই প্রত্যাশা ভেঙে যায়। ক্রেতার মনে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা ও অসন্তোষ। একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের ক্ষেত্রে এই অনিশ্চয়তা আরও বেশি উদ্বেগের। কারণ, এলপিজি এমন কোনো পণ্য নয়, যার ব্যবহার সহজে বন্ধ করা যায়।

নির্ধারিত দাম বনাম বাস্তব বাজার
এলপিজি বাজারের আরেকটি বড় সমস্যা হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত দাম এবং ভোক্তার প্রকৃত ক্রয়মূল্যের মধ্যে ব্যবধান। বিইআরসি প্রতি মাসে দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাস্তবে অনেক ভোক্তাকে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি দাম দিয়েও সময়মতো সিলিন্ডার পাওয়া যায় না।

এখানে সরকারি ও বেসরকারি এলপিজির দামের ব্যবধানও আলোচনার দাবি রাখে। সরকারি সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৭৭৬ দশমিক ৯৩ টাকা অপরিবর্তিত থাকলেও বেসরকারি বাজারে কাছাকাছি পরিমাণের গ্যাসের দাম প্রায় ২ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। কাগজে-কলমে এই ব্যবধান সাধারণ মানুষের কাছে বড় ধরনের বৈষম্য বলে মনে হতে পারে।

কিন্তু সরকারি এলপিজির দাম কম থাকলেই সমস্যার সমাধান হয় না। সেই গ্যাস যদি বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া না যায় তাহলে কম দামের সুবিধা ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সাত মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এক কেজি এলপিজিও আমদানি করতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। এখানে বাজারব্যবস্থাপনার একটি মৌলিক সত্য মনে রাখা প্রয়োজন: যে পণ্য নির্ধারিত দামে পাওয়া যায় না, সেই দাম ভোক্তার কাছে কার্যত অর্থহীন। সুলভ মূল্যের পাশাপাশি পণ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

আমদানি হচ্ছে, তবু সংকট কেন?
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। প্রায় ১ কোটি গ্রাহক এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। মোট ব্যবহারের প্রায় ৮০ শতাংশ গৃহস্থালির রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। অথচ বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশ সরবরাহ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল।

আমদানির পরিসংখ্যানেও ওঠানামা রয়েছে। ২০২৩ সালে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছিল প্রায় ১২ দশমিক ৭৫ লাখ টন, ২০২৪ সালে ১৬ দশমিক ১০ লাখ টন এবং ২০২৫ সালে ১৪ দশমিক ৬৫ লাখ টন। অর্থাৎ ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় আমদানি কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। সাম্প্রতিক সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) জানিয়েছে, আগস্টে প্রায় ১ দশমিক ৫৮ লাখ টন এবং সেপ্টেম্বরে প্রায় ১ দশমিক ৫৬ লাখ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। অন্যদিকে এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এবং সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন।

এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—আমদানি যদি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হয়ে থাকে তাহলে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি বা অতিরিক্ত দামের অভিযোগ কেন? এর উত্তর খুঁজতে শুধু আমদানির পরিমাণ জানলেই হবে না। আমদানিকৃত গ্যাসের কতটুকু বোতলজাত হয়েছে, কতটুকু মজুদ  রয়েছে, কতটুকু বাজারে ছাড়া হয়েছে এবং কোন অঞ্চলে কী পরিমাণ সরবরাহ করা হয়েছে তারও হিসাব প্রয়োজন। আমদানি থেকে ভোক্তার রান্নাঘর পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের তথ্য প্রকাশ না করলে প্রকৃত সমস্যাটি চিহ্নিত করা কঠিন।

ব্যাংকের এলসি, ডলার ও সরবরাহের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক
এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি বড় আমদানির জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়। আমদানিকারকদের ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণপত্র বা এলসি খুলতে হয়। ডলারের সংকট, ব্যাংকের অর্থায়ন সক্ষমতা কিংবা এলসি খোলার জটিলতা তৈরি হলে আমদানি প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে।

এখানে একটি বিষয় বোঝা জরুরি—ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকলেই আমদানি নির্বিঘ্ন হবে এমন নয়। প্রয়োজনীয় সময়ে এলসি খোলা যাচ্ছে কি না, ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ করতে পারছে কি না এবং আমদানির অর্থায়ন কতটা সহজ হচ্ছে সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু এলপিজি একটি অত্যাবশ্যকীয় ও আমদানিনির্ভর জ্বালানি, তাই এর আমদানি অর্থায়নকে নীতিগত অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। একইসঙ্গে আমদানিকারকদের জন্য পূর্বানুমানযোগ্য ব্যাংকিং ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।

রংপুরসহ আঞ্চলিক বাজারে শেষ মাইলের সংকট
রাজধানী বা বড় শহরের বাজারের সঙ্গে রংপুরের মতো আঞ্চলিক শহরের এলপিজি সরবরাহব্যবস্থার কিছু বাস্তব পার্থক্য রয়েছে। আমদানির পর বন্দর থেকে গ্যাস বিভিন্ন বোতলজাতকরণ কেন্দ্র, পরিবেশক, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিক্রেতার মাধ্যমে ভোক্তার কাছে পৌঁছায়। প্রতিটি ধাপে পরিবহন ব্যয়, পরিচালন ব্যয় ও ব্যবসায়িক মার্জিন যুক্ত হয়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও উপজেলা পর্যায়ে পরিবহনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং পর্যাপ্ত পরিবেশকের অভাব সরবরাহকে ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। সংকটের সময় এসব অঞ্চলের ভোক্তারাই বেশি ভোগান্তিতে পড়েন।

এ ক্ষেত্রে ছোট আকারের সিলিন্ডারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন ৫ দশমিক ৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৮৪২ টাকা। প্রতি কেজির হিসাবে দাম কাছাকাছি হলেও একবারে তুলনামূলক কম অর্থ ব্যয় করতে হয়। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর সীমিত নগদ অর্থের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ছোট সিলিন্ডারের সহজলভ্যতা ও বাজারজাতকরণ বাড়ানো যেতে পারে।

সংকট সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
এলপিজি বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

মাসিক আমদানি, জাতীয় মজুদ, বোতলজাতকরণ এবং জেলাভিত্তিক সরবরাহের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। এতে বাজারের প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা সহজ হবে এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ কমবে। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম সমন্বয় করতে হবে। তবে মূল্যবৃদ্ধির প্রতিটি উপাদান—আন্তর্জাতিক দর, জাহাজভাড়া, প্রিমিয়াম, বিনিময় হার ও অন্যান্য ব্যয়ের হিসাব—ভোক্তার সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা উচিত। মূল্য ওঠানামার প্রভাব কমাতে স্থিতিশীলতা-ব্যবস্থা নিয়েও নীতিগত আলোচনা প্রয়োজন। এলপিজি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় এলসি খোলা ও বৈদেশিক মুদ্রা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। পর্যাপ্ত মজুদ সক্ষমতা, আধুনিক টার্মিনাল এবং কার্যকর পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একইসঙ্গে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৌশলগত মজুদ গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। সরকারি এলপিজির কম দাম তখনই অর্থবহ হবে, যখন সাধারণ মানুষ বাস্তবে সেই গ্যাস কিনতে পারবেন। বিপিসির আমদানি ও সরবরাহ সক্ষমতা বাড়িয়ে সরকারি খাতের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নির্ধারিত দামের অতিরিক্ত অর্থ আদায়, মজুতদারি এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির বিরুদ্ধে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। একইসঙ্গে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের জন্য যৌক্তিক ব্যবসায়িক মার্জিন নিশ্চিত করতে হবে যাতে সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি অংশগ্রহণকারী ন্যায্যভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।

সিলিন্ডারের দাম নয়, নিশ্চিত সরবরাহও গুরুত্বপূর্ণ
এলপিজির বাজার আসলে একটি পারস্পরিক নির্ভরতার জাল। সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক মূল্য, সমুদ্রপথের জাহাজভাড়া, ব্যাংকের এলসি, ডলারের প্রাপ্যতা, আমদানিকারকের দক্ষতা, পরিবেশকের সততা, খুচরা বিক্রেতার ন্যায্যতা এবং সরকারের কার্যকর নজরদারি—সবকিছুই এই বাজারের সঙ্গে যুক্ত। একটি জায়গায় দুর্বলতা তৈরি হলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পড়ে সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে।

মার্চে ১ হাজার ৩৪১ টাকা থেকে নভেম্বরে ২ হাজার ৬০ টাকা—মাত্র আট মাসে ৭১৯ টাকা মূল্যবৃদ্ধি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এলপিজি এখন শুধু জ্বালানি বা বাণিজ্যিক পণ্যের বিষয় নয়; এটি জনজীবনের ব্যয়, পারিবারিক নিরাপত্তা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একটি কার্যকর বাজারব্যবস্থার সাফল্য শুধু পণ্যের দাম নির্ধারণে নয়, বরং নির্ধারিত দামে পণ্যটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতায়। তাই এলপিজি বাজারে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, প্রতিযোগিতা এবং কার্যকর তদারকি।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সাধারণ: মাসের শেষে একটি পরিবারের রান্নার গ্যাস ফুরিয়ে গেলে তারা কি ন্যায্য দামে, সহজে এবং নিশ্চিন্তে নতুন একটি সিলিন্ডার কিনতে পারবে? এই প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত এলপিজি বাজার ব্যবস্থাপনার প্রকৃত সাফল্য।