রাজধানী ঢাকার সড়কে যানজট, অপরিকল্পিত পার্কিং, ফুটপাত দখল ও গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলার মধ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার (ই-রিকশা) বিস্তার নগর পরিবহনব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে। স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের সহজলভ্য মাধ্যম হিসেবে এসব যানবাহনের চাহিদা থাকলেও অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, অনুপযুক্ত কাঠামো, চালকদের প্রশিক্ষণের অভাব ও ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা সড়কের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে ই-রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। তবে বিধিমালার উদ্দেশ্য এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনার মধ্যে যে অসঙ্গতি ও সীমাবদ্ধতা দেখা যাচ্ছে, তাতে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরার বদলে নতুন করে জটিলতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
গত ২৯ অক্টোবর স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে। এর আওতায় দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশনে নিবন্ধন, জোনভিত্তিক চলাচল, রঙের মাধ্যমে যানবাহন শনাক্তকরণ এবং কারিগরি মান নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিধিমালা জারির পরও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে কোন জোনে কতটি রিকশা চলবে, পুরোনো রিকশার নিবন্ধন কীভাবে হবে, চালকদের যোগ্যতা কীভাবে যাচাই করা হবে কিংবা নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে— এসব বিষয়ে এখনও স্পষ্টতা নেই। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণের কাঠামো তৈরি হলেও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক ও পরিচালনাগত প্রস্তুতি এখনও অসম্পূর্ণ। তাই ই-রিকশা বিধিমালায় যৌক্তিক সংশোধন আনা উচিত।
একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে পাঁচটি রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ঢাকায় অনেক মালিকের ২০ থেকে ৩০টি পর্যন্ত ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে। তাদের পরিবারের সদস্যদের নামে আলাদা নিবন্ধন নিয়ে একই সংখ্যক রিকশা রাস্তায় রাখার সুযোগ তৈরি হলে প্রকৃত অর্থে যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। বরং নিবন্ধনের মাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিত রিকশা চলাচল আইনি স্বীকৃতি পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। নিবন্ধনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বিদ্যমান রিকশার সংখ্যা গণনা, প্রয়োজন নিরূপণ এবং নির্ধারিত সীমার মধ্যে চলাচল নিশ্চিত করা; কেবল মালিকের পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে নিবন্ধন দেওয়া নয়।
এক্ষেত্রে প্রথমেই ঢাকার সড়কে প্রকৃতপক্ষে কতটি ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে, তার একটি পূর্ণাঙ্গ জরিপ প্রয়োজন। জনসংখ্যা, সড়কের ধারণক্ষমতা, যাত্রী চাহিদা, গণপরিবহনের প্রাপ্যতা ও বিকল্প যাতায়াতব্যবস্থা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি জোনের জন্য রিকশার সর্বোচ্চ সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে। শুধু জোন ভাগ করে ভিন্ন রঙের রিকশা নামালেই যানজট কমবে না। বরং নির্ধারিত সীমার বাইরে রিকশা চলাচল বন্ধ এবং জোনের সীমানা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা সুনির্দিষ্ট করতে হবে। একইসঙ্গে জোনের সংযোগস্থলে যাত্রী ওঠা-নামার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় এসব স্থান নতুন যানজটের কেন্দ্রে পরিণত হবে। যাত্রীদের দীর্ঘ পথ যেতে বারবার রিকশা পরিবর্তনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হলে সময় ও ভাড়া উভয়ই বাড়বে। তাই জোনভিত্তিক ব্যবস্থার পাশাপাশি নির্দিষ্ট রুটে চলাচল এবং গণপরিবহনের সঙ্গে সংযোগের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
আরেকটি বড় সমস্যা রিকশার কারিগরি মান ও চালকদের দক্ষতা। দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে তৈরি হওয়া পুরোনো রিকশাগুলোকে উপযুক্ত যন্ত্রাংশ সংযোজনের মাধ্যমে নিরাপদ করা সম্ভব কি না, তা নিরপেক্ষ কারিগরি পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। সব পুরোনো যানবাহনকে কেবল নিবন্ধনের আওতায় আনার জন্য সনদ দেওয়া হলে বিধিমালার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। যেসব যানবাহন ন্যূনতম নিরাপত্তা মান পূরণে সক্ষম নয়, সেগুলো ধাপে ধাপে চলাচল থেকে প্রত্যাহার করতে হবে।
ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তারকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। স্বল্প আয়ের মানুষের যাতায়াতের প্রয়োজন এবং বিপুলসংখ্যক চালকের জীবিকা এর সঙ্গে যুক্ত। তাই নিয়ন্ত্রণের নামে একযোগে উচ্ছেদ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করে নিরাপদ বিকল্প নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকায় সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও সহজলভ্য গণপরিবহনের বিস্তার ঘটানো গেলে স্বল্প দূরত্বে রিকশার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও কমবে। ফুটপাত ও সাইকেল চলাচলের পথ দখলমুক্ত রাখা, বাসের নির্ধারিত স্টপেজ কার্যকর করা এবং অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণও একই পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত।
ঢাকা মহানগরের সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ই-রিকশা বিধিমালা প্রয়োজনীয় একটি পদক্ষেপ হতে পারে, কিন্তু কেবল নিবন্ধন, রঙ ও জোন নির্ধারণ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, কারিগরি নিরাপত্তা, চালকদের প্রশিক্ষণ, কার্যকর নজরদারি এবং বিকল্প গণপরিবহনের সমন্বিত ব্যবস্থা। অন্যথায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত নিবন্ধন ও ফি আদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
