চলতি অর্থবছরের ৩ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি ৩১% (ভিডিও)

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: চলতি (২০২৬-২৭) অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে ঘাটতি রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে পণ্য (আমদানির-রপ্তানি) বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। এ সময় আমদানি-রপ্তানি দুটোই বাড়লেও আমদানি বৃদ্ধির হার ছিল রপ্তানি বৃদ্ধির দ্বিগুণ। আর গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৫ দশমিক ৭২ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ১ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩০ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

একই সময়ে দেশে চলতি হিসাবে ঘাটতি বেড়ে হয়েছে ১৩৩ কোটি ২০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ঘাটতি ছিল ৮২ কোটি ১০ লাখ ডলার। শুধু তাই নয়, গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক ভারসাম্যে ৮৫ কোটি ৩০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত থাকলেও চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা ১১৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঘাটতিতে নেমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালান্স অব পেমেন্টস) সংক্রান্ত সর্বশেষ পরিসংখ্যানে এ চিত্র উঠে এসেছে।

 

আমদানি ব্যয়ের উচ্চ প্রবৃদ্ধিতে বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতি
মূলত বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধির প্রধান কারণ আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১৯ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি ব্যয় ছিল ১৬ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ২ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার বা ১৫ দশমিক ১ শতাংশ।

আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ ছিল জ্বালানি খাত। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৪ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১০৫ শতাংশ। এছাড়া রমজানকে সামনে রেখে চিনি, ভোজ্য তেল আমদানি বেড়েছে। পাশাপাশি গম, তৈলবীজ ও ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য আমদানি বেড়েছে। তৈরি পোশাক খাত সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানি বাড়লেও মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচা তুলার আমদানি কমেছে।

অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১১ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ১১ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ তিন মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৭ শতাংশ। এ সময় তৈরি পোশাক রপ্তানি ৬ দশমিক ২ শতাংশ। তিন মাসে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১০ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছর একই সময় ছিল এর পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার।

এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছর বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৪ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছর রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি হারে বাড়ায় বাণিজ্য ঘাটতি আরও বড় হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, রপ্তানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধির এই ব্যবধান বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ও রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরির অন্যতম কারণ।

রেমিট্যান্সে স্বস্তি, তবু চলতি হিসাবে ঘাটতি
বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে প্রবাসী আয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৮৫৯ কোটি ২০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৭৫৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এ হিসাবে প্রবাসী আয় বেড়েছে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে রেমিট্যান্স ও অন্যান্য ব্যক্তিগত স্থানান্তর থেকে আয় বাড়লেও পণ্য ও সেবা বাণিজ্যের ঘাটতি এবং প্রাথমিক আয় খাতের অর্থপ্রবাহের কারণে চলতি হিসাবে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে সেবা খাতে ঘাটতি হয়েছে ১২৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আর প্রাথমিক আয় খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৩০ কোটি ১০ লাখ ডলার।

আর্থিক হিসাবে কমেছে উদ্বৃত্ত
চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত হয়েছে ৩২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ উদ্বৃত্ত ছিল ১৭৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত কমেছে ১৪৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এ সময়ে নিট বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে ৩৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার। অর্থাৎ বিদেশি বিনিয়োগ কিছুটা কমেছে।

ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধের হিসাবেও চাপ রয়েছে। প্রথম তিন মাসে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে ৫৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। বিপরীতে ঋণের আসল পরিশোধ করা হয়েছে ৮৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

সামগ্রিক ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত থেকে ঘাটতিতে
চলতি হিসাব, মূলধনি হিসাব ও আর্থিক হিসাবসহ বিভিন্ন বৈদেশিক লেনদেনের সমন্বিত ফলাফল হচ্ছে সামগ্রিক ভারসাম্য বা ওভারঅল ব্যালান্স। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সামগ্রিক ভারসাম্যে ১১৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঘাটতি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে ৮৫ কোটি ৩০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সামগ্রিক ভারসাম্যে ২০১ কোটি ৭০ লাখ ডলারের অবনতি হয়েছে।

সামনে বৈদেশিক খাতে চাপের শঙ্কা
সামগ্রিকভাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের বৈদেশিক লেনদেনের চিত্র বলছে, রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকলেও তা আমদানি ব্যয়ের উচ্চ প্রবৃদ্ধি এবং অন্যান্য বৈদেশিক দায় সামাল দিতে পারছে না। বিশেষ করে বাণিজ্য ঘাটতির দ্রুত বৃদ্ধি, চলতি হিসাবের ঘাটতি এবং আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্ত কমে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগের দুর্বল প্রবাহ পরিস্থিতিকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলছে।

বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, রেমিট্যান্সের আনুষ্ঠানিক প্রবাহ বাড়ানো, উৎপাদনমুখী আমদানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা জরুরি। অন্যথায় আমদানি ব্যয়ের উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের দুর্বলতা অব্যাহত থাকলে সামনের মাসগুলোতে রিজার্ভের ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।