ফের ৪১ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

মোফাজ্জল বিদ্যুৎ, ঢাকা: প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে দুই যুগের বেশি সময় ধরে হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে সরকার। এসব কর্মসূচিতে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও শিক্ষার্থী ভর্তির হার বাড়লেও শিক্ষার গুণগত মান ও দক্ষ শিক্ষকের সংকট কাটেনি। সর্বশেষ চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪) শেষ হয়েছে গত বছরের জুনে। আগের দুটি কর্মসূচির সমাপ্তি প্রতিবেদনও দাখিল হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে ৪১ হাজার ৯০ কোটি ৪৮ লাখ টাকার পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) অনুমোদন দিয়েছে সরকার।

নতুন কর্মসূচির মোট বরাদ্দের অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ২১ হাজার ২৩৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় হবে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণ ও শিক্ষার্থীদের পোশাকসহ বিভিন্ন সামগ্রী বিতরণে। অন্যদিকে ৪৩৬ কোটি টাকার বেশি পরামর্শক ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।

গতকাল বুধবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় কর্মসূচিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।


প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। এতে সরকারি অর্থায়ন থাকবে ৩৩ হাজার ২০৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা। বাকি ৭ হাজার ৮৮৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউনিসেফ ও ইউনেস্কোসহ বিভিন্ন সংস্থার অর্থায়নে যুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি।

ভবন নির্মাণ ও পোশাকে অর্ধেকের বেশি বরাদ্দ
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, অবকাঠামো নির্মাণে বরাদ্দ ১০ হাজার ৮৮১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা যা মোট ব্যয়ের ২৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এতে ১৫ হাজার ৬৪১টি শ্রেণিকক্ষ, ১ হাজার ৫০০টি ওয়াশ ব্লক, ১০ হাজারটি সীমানাপ্রাচীর এবং জেলা-উপজেলা শিক্ষা অফিসসহ বিভিন্ন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম, ব্যাগ, জুতা ও মোজা বিতরণে বরাদ্দ ১০ হাজার ৩৫২ কোটি ৫১ লাখ টাকা যা মোট ব্যয়ের ২৫ দশমিক ১৯ শতাংশ।

কর্মসূচিতে দুর্গম এলাকায় অস্থায়ী বিদ্যালয় স্থাপন, শিক্ষকদের জন্য ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ উদ্যোগ, মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং পাঠদান পদ্ধতি উন্নয়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ ও শিখনফল উন্নত করাই এসব উদ্যোগের লক্ষ্য।

পরামর্শক ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন
প্রকল্পে ৪৩৬ কোটি টাকার বেশি পরামর্শক ব্যয় রাখা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন এ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছে।

একনেক সভা শেষে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, কর্মসূচিটির বিভিন্ন ব্যয় নিয়ে আগেও পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। সংশোধিত প্রস্তাব পর্যালোচনার পর দ্বিতীয় দফায়ও পরামর্শক প্যাকেজসহ কয়েকটি খাতের ব্যয় নিয়ে আপত্তি জানানো হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করতে হবে। পাশাপাশি পরিচালন প্রকৃতির ব্যয় রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তরের নির্দেশনা রয়েছে।

এদিকে পিইডিপি-৩ ও পিইডিপি-৪-এর প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদন (পিসিআর) এখনও দাখিল হয়নি। ফলে আগের কর্মসূচিগুলোর লক্ষ্য অর্জন ও সীমাবদ্ধতার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সামনে আসেনি।

শিক্ষক দক্ষতা ও শিখনমানে গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, অতীতে বিপুল বিনিয়োগে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে পরিমাণগত উন্নয়ন হলেও শিক্ষার গুণগত রূপান্তর ঘটেনি। নতুন কর্মসূচিতে একই ধরনের বিনিয়োগের পুনরাবৃত্তি হলে তা দুঃখজনক হবে।

তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের সিংহভাগ বাজেট কেবল অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় না করে শিক্ষক দক্ষতা ও শিখনমান বৃদ্ধিতে কাজে লাগানো জরুরি।’

তবে আধুনিক ভবন, গ্রন্থাগার ও শিক্ষা-সহায়ক সুবিধার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে বলে মনে করেন এই শিক্ষাবিদ। তার মতে, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিখনমান উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে অবকাঠামোর সঙ্গে ভারসাম্য নিশ্চিত করলেই কর্মসূচিটি কার্যকর হবে।