ফজলুর রহমান রনি, ঢাকা: দুই অপারেটর রবি ও এয়ারটেলের একীভূতকরণের সময় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) দেওয়া শর্ত লঙ্ঘন করে দীর্ঘ এক দশক ধরে পৃথক ব্র্যান্ড ও নম্বর সিরিজ চালিয়ে যাচ্ছে রবি আজিয়াটা লিমিটেড। ২০১৬ সালের ২৬ অক্টোবর নিয়ন্ত্রক সংস্থার দেওয়া অনুমোদন প্রজ্ঞাপনের ২০ নম্বর শর্তে নির্দেশনা ছিল যে, একত্রীকরণের পর সব পণ্য ও সেবার বাজারজাতকরণে কেবল ‘রবি আজিয়াটা লিমিটেড’ নাম ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে রবি ও এয়ারটেল নামে দুটি আলাদা ব্র্যান্ড চালু রাখায় সৃষ্ট দীর্ঘ আইনি বিরোধ একপর্যায়ে চরম রূপ নেয়।
শর্ত ভাঙার মধ্য দিয়ে বাজারে অন্যায্য সুবিধা নেওয়ার অভিযোগে চলতি বছরের ৮ জুলাই রবির বিরুদ্ধে ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ চেয়ে আদালতে মামলা করে প্রতিযোগী অপারেটর বাংলালিংক। এর রেশ না কাটতেই গত ১৭ আগস্ট এয়ারটেল ব্র্যান্ড বাদ দিয়ে ‘সার্কেল’ নামে নতুন পরিচয় আনে রবি। তবে নাম বদলালেও অতীতের এই শর্ত লঙ্ঘন ও আইনি দায়ের বিষয়টি এখনও সুরাহা হয়নি। তাই নতুন ব্র্যান্ড দিয়ে অপারেটরটির রেহাই পাওয়ার সুযোগ কতটুকু, তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্রমতে, ২০১৬ সালে রবি ও এয়ারটেলের কার্যক্রম একীভূত হওয়ার পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অপারেটর হিসেবে রবির ভিত্তি মজবুত হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী অপারেটরগুলোর দাবি, একীভূতকরণ পরিকল্পনা অনুযায়ী সব সেবা এক ব্র্যান্ডের অধীনে আনার বাধ্যবাধকতা থাকলেও রবি বাণিজ্যিক সুবিধা পেতে এয়ারটেলকে পৃথকভাবে চালিয়েছে। যদিও রবির যুক্তি এয়ারটেল তাদের অর্জিত ব্যবসায়িক সম্পদ ও ব্র্যান্ডের অংশ, তাই এটিকে আলাদা অপারেটর পরিচালনার সমতুল্য মনে করে না প্রতিষ্ঠানটি।
একইভাবে অপারেটর প্রিফিক্স হিসেবে ‘০১৬’ নম্বর সিরিজের ক্ষেত্রেও একীভূতকরণের অনুমোদনে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। নির্ধারিত মেয়াদের পর বিটিআরসির নতুন কোনো অনুমোদন ব্যতিরেকেই রবি দীর্ঘ সময় ধরে এই নম্বর সিরিজ ব্যবহার করে আসছে বলে প্রতিযোগী অপারেটরগুলো লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেছে। ফলে রিব্র্যান্ডিং করে এয়ারটেলের নাম বদলে ‘সার্কেল’ রাখা হলেও ‘০১৬’ সিরিজের ব্যবহারের আইনি জটিলতা বহাল রয়ে গেছে।
মূলত ২০১৬ সালে রবি আজিয়াটা ও এয়ারটেল বাংলাদেশের একীভূতকরণ সম্পন্ন হলেও তৎকালীন রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দীর্ঘ নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে রবি বাজারে আগ্রাসী বাণিজ্যিক কৌশল অব্যাহত রাখে। ফলে বছরের পর বছর ধরে চলা এই অনিয়ম শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টে রিট আবেদন এবং পরবর্তী সময়ে বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ মামলায় গড়ায়। দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে সমান প্রতিযোগিতার নিয়ম এবং একীভূতকরণের পর একটি কোম্পানির একাধিক পৃথক ব্র্যান্ড পরিচালনা সংক্রান্ত আইনি প্রশ্নগুলো বর্তমানে আদালত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে বিচারাধীন।
প্রাপ্ত নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর গ্রামীণফোন এবং ৩০ অক্টোবর বাংলালিংক একীভূতকরণের শর্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে বিটিআরসিতে আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত আবেদন করে। বিটিআরসির নিষ্ক্রিয়তা চ্যালেঞ্জ করে ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করে বাংলালিংক। সেই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০ মে বিটিআরসি রবির কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি পাঠায়। রবির পক্ষ থেকে এর কী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে তা প্রকাশ করেনি বিটিআরসি।
এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ৮ জুলাই ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালতে রবির বিরুদ্ধে ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলার করে বাংলালিংক। মামলার অভিযোগে বলা হয়, প্রায় ১০ বছর ধরে এয়ারটেল ব্র্যান্ড চালু রাখা এবং বিটিআরসির অনুমোদন ছাড়া ‘০১৬’ নম্বর সিরিজ ব্যবহারের মাধ্যমে রবি বাজারে অন্যায্য বাণিজ্যিক সুবিধা ভোগ করেছে। এতে বাংলালিংকসহ অপরাপর প্রতিদ্বন্দ্বী অপারেটরগুলো বিপুল আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছে। ক্ষতিপূরণের অর্থের পাশাপাশি মামলা দায়েরের তারিখ থেকে অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত বার্ষিক ১৫ শতাংশ সুদ এবং মামলার আনুষঙ্গিক খরচ দাবি করা হয়েছে। আদালতের বিচারে এখন বাংলালিংককে রবির অপতৎপরতার সঙ্গে তাদের প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক প্রমাণ করতে হবে।
মামলা ও রিটের আইনি চাপের মুখেই গত ১৭ আগস্ট এয়ারটেল বদলে ‘সার্কেল’ চালুর ঘোষণা দেয় রবি। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এয়ারটেলের বিদ্যমান গ্রাহকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন ব্র্যান্ডের আওতায় নেওয়া হয়েছে এবং তাদের নম্বর, প্যাকেজ ও ব্যালান্স বহাল থাকছে। অর্থাৎ নাম পরিবর্তন হলেও রবির আগের গ্রাহকভিত্তি ও মূল সেবা কাঠামো সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে একজন টেলিযোগাযোগ আইন বিশেষজ্ঞ জানান, কোনো প্রতিষ্ঠান ব্র্যান্ডের নাম বদল করলেই অতীতের আইনি ও চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত হতে পারে না। একীভূতকরণের সময় হাইকোর্ট ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা যে শর্ত বেঁধে দিয়েছিল, তার ব্যত্যয় ঘটে থাকলে নাম পরিবর্তনের পরও সেই দায় পৃথকভাবে আইনি প্রক্রিয়ায় বিবেচিত হবে। ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণের যৌক্তিকতা ও ক্ষতিপূরণের পরিমাণ এখন আদালতে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।
বিটিআরসির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, একীভূতকরণের শর্ত লঙ্ঘন, এয়ারটেল ব্র্যান্ডের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার এবং ০১৬ নম্বর সিরিজের অভিযোগ সংক্রান্ত বিষয়গুলো তাদের আইনি ও লাইসেন্সিং বিভাগ পর্যালোচনা করছে এবং রবির কৈফিয়ত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। নাম বদলের মাধ্যমে অতীতের অভিযোগ ও দায়ের আইনগত নিষ্পত্তি হয়েছে কিনা, তা মূল নথি পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন ‘কোন অপারেটরের একীভূতকরণের শর্তে যদি দুটি আলাদা প্রিফিক্স ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ থাকে তাহলে তারা দুটি আলাদা প্রিফিক্স ব্যবহার করতে পারবে। অন্যথায় তা পারবে না। এটা নিয়ে আমরা আমদের আইনি সহায়তাকারীদের ব্যখা দিয়েছি।’
অপর একটি অপারেটরের এক কর্মকর্তা বলেন সব অপারেটরদের জন্য সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা প্রয়োজন এবং ব্র্যান্ড নাম বদলে ফেলা শর্তপূরণের জন্য যথেষ্ট কি না, তা বিটিআরসির স্পষ্ট করা প্রয়োজন। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের এক অধ্যাপক জানান, ব্র্যান্ড পরিবর্তন, একীভূতকরণের শর্ত ও বাজারে প্রতিযোগিতার প্রভাব ভিন্ন বিষয়। নতুন নাম দিলেই আগের বাণিজ্যিক ক্ষতিপূরণ বা চুক্তি ভঙ্গের দায় মুছে যায় না; এর নিষ্পত্তি আদালতের সিদ্ধান্ত ও নথিপত্রের পর্যালোচনার ওপরই নির্ভর করছে।
এ অবস্থায় ব্যবসায়িক রূপ বদলে ‘সার্কেল’ নামে রবির নতুন অধ্যায় শুরু হলেও ২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পরিচালিত অবৈধ সুবিধা ও আইনি লঙ্ঘনের যে প্রশ্ন উঠেছে, তার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখন আদালত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন উত্তর দেননি। বরং এ সংক্রান্ত প্রশ্ন জনসংযোগ বিভাগের মাধ্যমে রবি আজিয়াটার লিখিতভাবে পাঠাতে বলেন। পরবর্তী সময়ে রবি আজিয়ারটা জনসংযোগ কর্মকর্তা শামিম আহমেদ প্রশ্ন পাঠানো হলে তিনি তিন দিন সময় নিয়েও কোনো উত্তর দেননি।
গ্রাহকস্বার্থ রক্ষার তাগিদ দিয়ে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ এ প্রসঙ্গে জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘রবি ও এয়ারটেলের একীভূতকরণের সময় নির্ধারিত শর্তগুলো যথাযথভাবে প্রতিপালিত হয়েছে কি না, তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিকে স্বচ্ছভাবে যাচাই করতে হবে। মার্জারের ফলে গ্রাহকসেবার মান, নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি, প্রতিযোগিতা ও গ্রাহকস্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হয়েছে, তার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন জরুরি। কোনো শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নথি ও বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত করতে হবে। শর্ত লঙ্ঘন প্রমাণিত হলে নিয়ন্ত্রণ কমিশন কিংবা সরকার আইন ও বিধি অনুযায়ী দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে পারে। তাছাড়া মার্জারের প্রতিটি শর্তের বাস্তবায়ন ও গ্রাহকস্বার্থ রক্ষার অগ্রগতি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হোক এটা আমরা চাইতেই পারি।’
