উপকূলীয় কৃষিতে নতুন দিগন্ত

গাজীপুর প্রতিনিধি: বাংলাদেশের কৃষি গবেষণায় এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের গবেষকদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম এবং ‘লোকেশন স্পেসিফিক টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট (এলএসটিডি)’ প্রকল্পের অর্থায়নে উদ্ভাবিত হয়েছে লবণাক্ততা-সহনশীল উচ্চফলনশীল নতুন ধানের জাত ‘ব্রি ধান১১৯’। রোপা আমন ও বোরো দুই মৌসুমে চাষের উপযোগী জাতটি উপকূলীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। গত ২৮ অক্টোবর ২০২৬ অনুষ্ঠিত জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৬তম সভায় জাতটি রোপা আমন মৌসুমে চাষের চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছে। লবণাক্ততাপ্রবণ উপকূলীয় অঞ্চলের পাশাপাশি অলবণাক্ত অনুকূল পরিবেশেও ব্রি ধান১১৯ চাষের উপযোগী। 

ব্রি ধান১১৯ উদ্ভাবনকারী গবেষক দলের নেতৃত্বে ছিলেন ব্রির উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ এখলাছুর রহমান। গবেষক দলের সহপ্রজননবিদ হিসেবে আরও দায়িত্ব পালন করেন একই বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হাসিনা খাতুন, সিনিয়র প্ল্যান্ট ব্রিডার নুসরাত জাহান, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আরমিন আক্তার সেতু এবং বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রিবেত ফারজানা দিশা। গবেষক দলের প্রজনন দক্ষতা ও এলএসটিডি প্রকল্পের আর্থিক সহায়তায় উদ্ভাবিত ব্রি ধান১১৯ রোপা আমন মৌসুমে চাষের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ায় উপকূলের ধান উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন মানসম্পন্ন বীজের সরবরাহ ও সঠিক চাষাবাদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই অর্জনের সুফল কৃষকের মাঠে পৌঁছে দেওয়াই পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

উপযুক্ত পরিচর্যায় জাতটির গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৫ দশমিক ৭ টন। লবণাক্ততার মাত্রা ও পরিবেশভেদে ফলন পাওয়া যায় ৪ দশমিক ৮ থেকে ৭ দশমিক ৬ টন পর্যন্ত। অনুকূল পরিবেশে ও কম লবণাক্ততায় জাতটি সর্বোচ্চ ফলন দিতে সক্ষম। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত ব্রি ধান৭৩-এর তুলনায় এর ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় এক টন বেশি। জাতটির জীবনকাল প্রায় ১১৫ দিন এবং গাছের গড় উচ্চতা ১১৩ সেন্টিমিটার। কাণ্ড মজবুত হওয়ায় এটি ঢলেপড়া সহনশীল। এর ডিগপাতা ব্রি ধান৭৩ এর তুলনায় বেশি খাড়া। পাশাপাশি শীষ থেকে ধান সহজে ঝরে পড়ে না। প্রতি শীষে গড়ে ২১৫টি পুষ্ট দানা পাওয়া যায়, যা ব্রি ধান৭৩ এর তুলনায় প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি বেশি। 

কক্সবাজারের মাঠপরীক্ষায় ফসলের বৃদ্ধিকালে লবণাক্ততার ওঠানামার মধ্যেও কৌলিক সারিটির উপযোগিতা মূল্যায়ন করা হয়েছে। তবে লবণাক্ততার মাত্রা, তার স্থায়িত্ব, গাছের বৃদ্ধিপর্যায় ও পরিচর্যার ওপর ফলন নির্ভর করে। পাশাপাশি সাতক্ষীরার লবণাক্ত অঞ্চল ও অলবণাক্ত অনুকূল পরিবেশে পর্যায়ক্রমিক ফলন পরীক্ষা চালানো হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকের অংশগ্রহণেও সারিটির উপযোগিতা মূল্যায়ন করা হয়েছে। আধুনিক প্রজনন কৌশল ও ধারাবাহিক মাঠপরীক্ষার সমন্বয়ে এই অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। 
স্বল্প জীবনকালসম্পন্ন হওয়ায় ব্রি ধান১১৯ উপকূলীয় অঞ্চলের শস্যবিন্যাসে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। রোপা আমন ধান কাটার পর মধ্যম উঁচু থেকে উঁচু জমিতে সূর্যমুখী ও লবণসহিষ্ণু সরিষা চাষের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যেতে পারে। ফলে উপযোগী এলাকায় একই জমিতে বছরে অতিরিক্ত একটি ফসল অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। 

রোপা আমন মৌসুমে ব্রি ধান১১৯ চাষের জন্য ১-৩০ জুলাইয়ের মধ্যে বীজ বপনের নির্দেশনা রয়েছে। এরপর ২৫ থেকে ৩০ দিন বয়সি চারা প্রতি গোছায় দুই থেকে তিনটি করে রোপণ করতে হবে। হেক্টরপ্রতি প্রস্তাবিত সারের পরিমাণ হলো— ইউরিয়া ২৩৪ কেজি, টিএসপি ৮৭ কেজি, এমওপি ১১৭ কেজি, জিপসাম ৭৮ কেজি এবং জিংক সালফেট ১২ কেজি। শেষ জমি চাষের সময় সম্পূর্ণ টিএসপি, জিপসাম ও জিংক সালফেটের সঙ্গে অর্ধেক এমওপি প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া সমান তিন কিস্তিতে প্রয়োগের নির্দেশনা রয়েছে। 

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ব্রি ধান১১৯ আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীদের আধুনিক প্রজনন দক্ষতার এক অনন্য নিদর্শন। এটি শুধু লবণাক্ত উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের আশার আলোই দেখাবে না, বরং আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করতে এবং কৃষকের উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. খোন্দকার মো. ইফতেখারুদ্দৌলা জানান, মাত্র সাড়ে সাত বছরে এ ধরনের একটি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করা বড় একটি অর্জন। লবণাক্ততা সহনশীলতার পাশাপাশি অলবণাক্ত অনুকূল পরিবেশেও এর অসাধারণ ফলনশীলতা কৃষিতে বৈচিত্র্য আনবে।

গবেষক দলের নেতৃত্বদানকারী প্রধান প্রজননবিদ ড. মোহাম্মদ এখলাছুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ও চ্যালেঞ্জিং এই উদ্ভাবনী যাত্রার প্রতিটি ধাপে আমাদের টিম অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছে। কৃষকের মাঠে এর সুফল দেখতে পাওয়ার আনন্দই আমাদের আসল প্রাপ্তি। স্থানভিত্তিক ধানের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় ব্রি ধান১১৯-এর অনুমোদন একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য ও অনন্য উদ্ভাবন। লবণাক্ততাপ্রবণ উপকূলীয় অঞ্চলে ধানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা টেকসই করতে জাতটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশাবাদী।