মোফাজ্জল বিদ্যুৎ, ঢাকা: অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে দখল আর দূষণে হুমকিতে পড়েছে তুরাগ নদ। পাড় ঘেঁষা ১৭৩টি শিল্পকারখানার বর্জ্য দূষণে ধুঁকছে তুরাগ। এমন সংকট থেকে উত্তরণের জন্য নদটির দূষণ পর্যবেক্ষণ, দূষণের উৎস শনাক্ত এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ড্রোন কেনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থাপন করা হবে সার্বক্ষণিক অনলাইন পর্যবেক্ষণকেন্দ্র। আগামীকাল বুধবার অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম: তুরাগ নদের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় সমন্বিত দূষণ পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ ব্যবস্থা’ প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য তোলা হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের আওতায় ১৮৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে পরিবেশ অধিদপ্তর। বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে প্রকল্পের ১৮৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১০ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর নয়; দূষণকারী উৎস শনাক্ত করার পর বর্জ্য নির্গমন বন্ধ করা এবং নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও।
প্রকল্পের আওতায় প্রকল্পের আওতায় তুরাগ নদের তীরবর্তী ১৭৩টি শিল্পকারখানার বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপির কার্যকারিতা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, যা মোট প্রকল্পের ৭৮ শতাংশ। সেই হিসেবে একটি শিল্পকারখানার ইটিপির কার্যকারিতা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ব্যয় হবে ৮২ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। ড্রোন কেনার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি টাকা। প্রশিক্ষণের জন্য সরকারি ছয় দপ্তরের কর্মকর্তাদের বিদেশে যাওয়ার আবদার করা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ছয় দপ্তর হলো— পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি), অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রোগ্রাম বিভাগ, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) এবং পরিবেশ অধিপ্তরের কর্মকতারা। এছাড়া তুরাগ নদের তলদেশ পরিষ্কারে ব্যয় হবে ২ কোটি টাকা।
শিল্পবর্জ্যের উৎস শনাক্তে অভিযান
প্রকল্পের আওতায় ১৭৩টি শিল্পকারখানার ইটিপির কার্যকারিতা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি দূষণের অভিযোগ ও ঝুঁকির ভিত্তিতে অন্তত ১০০টি পরিদর্শন ও অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। কোন কারখানা পরিবেশগত নিয়ম মানছে না, কোথা থেকে দূষিত পানি নদে যাচ্ছে এবং কোথায় বর্জ্য ফেলা হচ্ছে— এসব তথ্য সংগ্রহ করে দূষণকারী ও নিয়ম না মানা প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করা হবে।
নদের পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণে অনলাইনভিত্তিক তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। এর মাধ্যমে শিল্পকারখানার বর্জ্যপানির মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। তুরাগের তীরের বিভিন্ন স্থানে বর্জ্য ফেলার ঘটনা শনাক্ত করতে ড্রোন ব্যবহার, দূষণের হটস্পট চিহ্নিত করতে মানচিত্র তৈরি এবং নৌযানের মাধ্যমে টহলের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
এছাড়া অন্তত ৩৬ বার পানির নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার পরিকল্পনা রয়েছে। ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা বা জিআইএসের সঙ্গে সমন্বিত পর্যবেক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। দূষণের অভিযোগ জানাতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ৩৩৩-৪ হটলাইনকে আরও কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার প্রস্তাবও রয়েছে। নিয়ম ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নোটিশ ও জরিমানা এবং নদের তলদেশের বর্জ্য পরিষ্কারের কার্যক্রমও প্রকল্পের পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত।
গাবতলীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে পুরোনো উদ্বেগ
তুরাগের গাবতলী-আমিনবাজার এলাকায় রেডিমিক্স কংক্রিট কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও অতীতে উদ্বেগ দেখা গেছে। ওই এলাকার ছয়টি কারখানার সাতটি বর্জ্য নির্গমনপথ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। নির্মাণসামগ্রী মেশানো ও যন্ত্রপাতি ধোয়ার পর উৎপন্ন পানি যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে সিমেন্টের কণা ও ক্ষারীয় উপাদান পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ ধরনের বর্জ্য কোথায় যাচ্ছে এবং তা শোধন করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।
তবে কোনো কারখানার কাছাকাছি নদের পানি দূষিত দেখালেই ওই প্রতিষ্ঠানকে দূষণের জন্য দায়ী করা যায় না। এ ক্ষেত্রে বর্জ্য নির্গমনের পথ, নমুনা পরীক্ষা, ইটিপির কার্যকারিতা এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে দূষণের উৎস শনাক্ত করা প্রয়োজন। প্রকল্পের আওতায় প্রস্তাবিত পরিদর্শন ও পরীক্ষার কার্যক্রম এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সহায়তা করতে পারে।
তুরাগ ও বুড়িগঙ্গায় ২২৪ বর্জ্য নির্গমন উৎস
সরকারের একটি সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীতে বর্জ্য নির্গমনের ২২৪টি উৎস চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর মধ্যে তুরাগে ৫৮টি এবং বুড়িগঙ্গায় ১৬৬টি উৎস রয়েছে। ওই দুই নদের সম্মিলিত দূষণের ৫৫ শতাংশের জন্য শিল্পবর্জ্যকে দায়ী করা হয়েছে। এই হিসাব দুই নদের সম্মিলিত দূষণ পরিস্থিতির; শুধু তুরাগ নদের দূষণের ক্ষেত্রে একই হার প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের চাপে ঢাকার আশপাশের নদীগুলো দীর্ঘদিন ধরে দূষণ ও দখলের ঝুঁকিতে রয়েছে। শিল্পবর্জ্য, কঠিন বর্জ্য এবং অপরিশোধিত পানি নদে পড়লে জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়। তুরাগের দূষণ নিয়ন্ত্রণে তাই শুধু দূষণের উৎস শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; নিয়মিত নজরদারি, পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে সেই ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে কি না, তা যাচাই করাও জরুরি।
ব্যয়ের পাশাপাশি ফলাফল যাচাইয়ের প্রশ্ন
‘মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম: ইন্টিগ্রেটেড পলিউশন মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট সিস্টেম অব তুরাগ রিভার ইসিএ’ শীর্ষক প্রকল্পটির লক্ষ্য তুরাগ নদীর পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত নজরদারি ও আইন প্রয়োগব্যবস্থা শক্তিশালী করা। প্রকল্পে পরিবেশবান্ধব প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করতে গ্রিন স্টার রেটিং চালু এবং কার্বন নিঃসরণ কমানো ও কার্বন বাণিজ্যের সম্ভাবনা মূল্যায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটির মোট ব্যয়ের প্রায় পুরোটাই বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে মেটানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি নির্ধারিত কাজ কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তারও স্পষ্ট হিসাব থাকা প্রয়োজন। ১৭৩টি কারখানার মধ্যে কতটির ইটিপি কার্যকর পাওয়া গেল, কতটি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ বা জরিমানা করা হলো, কতটি দূষণের উৎস বন্ধ করা গেল এবং নদীর পানির মানে কী পরিবর্তন এলো— এসব সূচক দিয়ে প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
তুরাগের পানির রঙ বদলে যাওয়ার মতো দৃশ্যমান সংকেত দূষণ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা সামনে আনে। প্রস্তাবিত প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে নজরদারি যন্ত্রপাতি স্থাপন বা অভিযান পরিচালনার সংখ্যায় নয়; বরং নদে অপরিশোধিত বর্জ্য পড়া কতটা বন্ধ হলো এবং পানির গুণগত মান কতটা উন্নত হলো, তার ওপর।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, নাগরিকরা যখন কোনো পরিবেশগত সমস্যা নিয়ে সোচ্চার হয়, তখন জনচাপ সামাল দিতে সরকার নতুন প্রকল্প গ্রহণ করে। কিন্তু এসব প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবেশদূষণের স্থায়ী সমাধান কতটা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ, অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নই হয়ে উঠছে সংশ্লিষ্ট আমলা, প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের অনৈতিক আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ। ফলে পরিবেশগত সমস্যার মূল কারণ দূর করার চেয়ে নতুন প্রকল্প গ্রহণ ও বাজেট বরাদ্দের প্রবণতাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। তুরাগের ১৭৩টি কারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ১৮৪ কোটি টাকার প্রকল্পের সুফল নিয়েও তিনি সন্দিহান। তার প্রশ্ন, দূষণকারী কারখানার মালিকদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় ও শাস্তি নিশ্চিত হবে কি না। তিনি বলেন, প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি দূষণকারীদের কঠোর শাস্তি এবং পরিবেশের দৃশ্যমান উন্নতি নিশ্চিত করতে হবে।
