জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। কোটি কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করে দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে এই শিল্প। কিন্তু যে শ্রমিকদের ঘামে তৈরি হচ্ছে এসব পোশাক, তাদের মজুরির চিত্র একেবারেই উল্টো। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের চেয়ে কম মজুরি পান শুধু শ্রীলঙ্কার পোশাক শ্রমিকরা। তাই রপ্তানিতে দ্বিতীয় হলেও শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরির হিসাবে বাংলাদেশ রয়েছে প্রায় তলানিতে। প্রশ্ন উঠেছে, বিশ্ববাজারে এত বড় সাফল্যের পরও কেন ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন না শ্রমিকরা?
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, টানা পঞ্চমবারের মতো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হয়েছে বাংলাদেশ। গত বছর দেশটির পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ভিয়েতনামের চেয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বেশি।
কিন্তু শ্রমিকের মজুরির হিসাবে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা ডলারের হিসাবে প্রায় ১০১ ডলার। বাংলাদেশের চেয়ে কম মজুরি পান শুধু শ্রীলঙ্কার শ্রমিকরা। দেশটিতে এই মজুরি ৯০ ডলার। উজবেকিস্তানে তা ১০৬ ডলার।
অন্যদিকে পাকিস্তানে ১৪৫, ভিয়েতনামে ১৭৫, ভারতে ১৯২, কম্বোডিয়ায় ২১০, ইন্দোনেশিয়ায় ২২২ এবং চীনে ৩৩৭ ডলার। আর সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে তুরস্কে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি সবচেয়ে বেশি, ৬৬২ ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশের চেয়ে ভিয়েতনামের শ্রমিকরা প্রায় ৭৩ শতাংশ বেশি ন্যূনতম মজুরি পান।
তবে দেশভেদে মজুরি নির্ধারণের পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে। চীন, ভারত, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ায় অঞ্চল বা প্রদেশভেদে মজুরি নির্ধারণ করা হয়। অন্যদিকে কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও তুরস্কে নিয়মিত মজুরি সমন্বয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।
মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমাতেও পিছিয়ে বাংলাদেশ। কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও তুরস্কে সাধারণত প্রতিবছর মজুরি সমন্বয় করা হয়। ভিয়েতনাম ও চীনে এক থেকে দুই বছরের মধ্যে পর্যালোচনার প্রবণতা রয়েছে। ভারতে আইনগতভাবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর মজুরি পর্যালোচনার বিধান থাকলেও ছয় মাস অন্তর পরিবর্তনশীল মহার্ঘ ভাতা সমন্বয় হয়। বাংলাদেশে সাধারণত তিন বছর পর নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের বিধান রয়েছে।
দেশে পোশাক শ্রমিকদের সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৩ সালে। ওই বছরের ১২ নভেম্বর গেজেট প্রকাশের পর ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয় নতুন কাঠামো। এতে চারটি গ্রেডে সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করা হয় ১২ হাজার ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৩৫ টাকা। সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন ৬ হাজার ৭০০ টাকা। এর সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত ও খাদ্য ভাতা যুক্ত রয়েছে।
এ ছাড়া বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৯ শতাংশ করা হয়। অতিরিক্ত ৪ শতাংশ কার্যকর হয় ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে। তবে নতুন করে ন্যূনতম মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়নি।
এবার শ্রমিকদের বড় একটি অংশের দাবি, মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। বর্তমান মজুরির তুলনায় যা ১৭ হাজার ৫০০ টাকা বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি। ডলারের হিসাবে বর্তমান মজুরি প্রায় ১০১ ডলার হলেও ৩০ হাজার টাকা প্রায় ২৪২ ডলারের সমান।
শ্রমিকদের যুক্তি, চাল, ডাল, তেল, সবজি, বাড়িভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসার ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে আয় বাড়েনি। ফলে বর্তমান মজুরিতে সংসারের মৌলিক ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে বড় অঙ্কের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ রয়েছে মালিকপক্ষের। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয়, গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা এবং ক্রয়াদেশের ওঠানামার কারণে অনেক কারখানা আর্থিক চাপে রয়েছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানার জন্য একসঙ্গে বড় অঙ্কের মজুরি বৃদ্ধি বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, শ্রম আইন অনুযায়ী মজুরি বোর্ডে তথ্য-উপাত্ত ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে নতুন মজুরি নির্ধারণ করা উচিত। বোর্ডের সিদ্ধান্ত মালিকপক্ষ মেনে নেবে। তবে বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে, যাতে ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা ও দর-কষাকষি করা যায়।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, বর্তমান মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে নিত্যপণ্য, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বেড়েছে। নিয়মিত মজুরি পর্যালোচনা এবং মালিক, শ্রমিক ও সরকারের ত্রিপক্ষীয় আলোচনার ভিত্তিতে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ জরুরি।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সাফল্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এই সাফল্যের পেছনে থাকা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করাও জরুরি। রপ্তানিতে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নে নতুন মজুরি কাঠামো কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি
