ভূগোলের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চাই গভীর সমুদ্রবন্দর

হাবিবুর রহমান সাগর: গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের ‘কৌশলগত অবস্থান’ নিয়ে এত আলোচনা হয়েছে যে আমরা প্রায় বিশ্বাস করতে শুরু করেছি, ভূগোল নিজেই আমাদের পক্ষে কাজ করছে। কিন্তু কনটেইনারবাহী জাহাজের ক্যাপ্টেনের প্রশ্ন একটাই: তোমার বন্দরে পানি কতটা গভীর?

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯২ শতাংশ এবং কনটেইনারজাত পণ্যের ৯৮ শতাংশ পরিবাহিত হয়। ২০২৫ সালে বন্দরটি প্রথমবারের মতো ৩৪ লাখ টিইইউ ছাড়িয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা প্রায় ৩৫ লাখ ২০ হাজারে পৌঁছেছে। তবু লয়েডস লিস্টের শীর্ষ ১০০ কনটেইনার বন্দরের তালিকায় এর অবস্থান ৬৮তম। জুনে শুল্ক স্টেশনে দুই দিনের অচলাবস্থা এবং অক্টোবরে পরিবহন ধর্মঘটে প্রায় ৪৬ হাজার কনটেইনারের জট দেখিয়েছে, সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত কার্যক্রম নিশ্চিত করাও জরুরি। জাহাজ-মালিক কৌশলগত গুরুত্ব নয়, দেখেন তার জাহাজ কতক্ষণ আটকে থাকবে।

চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৫ মিটার এবং মোংলায় ৮ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারে। ফলে রপ্তানি পণ্য ছোট ফিডার জাহাজে অন্য দেশের বন্দরে নিয়ে সেখান থেকে বড় জাহাজে ইউরোপ-আমেরিকায় পাঠাতে হয়। এতে সময় ও খরচ বাড়ে, লাভের অংশ চলে যায় অন্যের বন্দরে।

সোনাদিয়া প্রকল্প ২০১৫ সালে বাতিল হয়েছে, পায়রার পরিকল্পনা ২০২১ সালে থিতিয়ে গেছে। ভরসা এখন মাতারবাড়ী, যেখানে ১৬ মিটার ড্রাফটের এবং ৮ হাজার ২০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ ভিড়তে পারবে। এতে সক্ষমতা বাড়বে প্রায় ১০ লাখ টিইইউ। কিন্তু ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে চালুর প্রত্যাশার বিপরীতে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে অগ্রগতি প্রায় ১৫ শতাংশ। অন্যদিকে হলদিয়ার ড্রাফট ৯ দশমিক ১ মিটার, ওডিশার গোপালপুরে ১৪ দশমিক ৫ মিটার। যে বন্দর আগে গভীর হবে, জাহাজ-কোম্পানির রুট পরিকল্পনায় এগিয়ে থাকবে সেটিই।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তৈরি পোশাক থেকে এসেছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার, যেখানে লক্ষ্য ছিল ৫৫ বিলিয়ন। অর্থাৎ রপ্তানির প্রায় ৮১ শতাংশ একটি খাতনির্ভর।

২৪ নভেম্বর ২০২৬ বাংলাদেশ এলডিসি তালিকা থেকে বের হচ্ছে। রপ্তানির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ শুল্কমুক্ত সুবিধায় যায়, যার ৫৪ শতাংশ যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে। একটি গবেষণায় শুল্ক গড়ে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়লে ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়েছে; অন্য বিশ্লেষণে তা বছরে ৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত। অনুমানের ব্যবধান থাকলেও প্রতিযোগিতা কঠিন হবে। দাম কমানোর বাস্তব উপায় লজিস্টিকস খরচ কমানো। তাই গভীর সমুদ্রবন্দর শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এলডিসি-পরবর্তী যুগে টিকে থাকার শর্ত।

বঙ্গোপসাগরের উপকূলে প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের বাস এবং বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পণ্য এই সাগর পাড়ি দেয়। অথচ ২০১৮ সালের এক গবেষণায় উপসাগরীয় দেশগুলোর পারস্পরিক বাণিজ্য ৫ শতাংশেরও কম, যেখানে আসিয়ানে ২৯ শতাংশ। শুধু বন্দর, সড়ক ও রেল নির্মাণ যথেষ্ট নয়; দরকার শুল্ক-সমন্বয়, অভিন্ন ডিজিটাল কাস্টমস, মানের পারস্পরিক স্বীকৃতি ও নির্ভরযোগ্য সময়সূচি। যে দেশ প্রথম কার্যকর আঞ্চলিক সংযোগ গড়বে, সে-ই বাণিজ্যে এগিয়ে যাবে।

বিনিয়োগ আসতে হবে বাংলাদেশের শর্তে, প্রকাশ্য প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে। বে টার্মিনাল ও লালদিয়ার মতো সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের প্রকল্পে আনুমানিক ১২ মিটার ড্রাফটের এবং ৫ থেকে ৬ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতার জাহাজ সামলানো যাবে। তাই অপারেটর, চুক্তির মেয়াদ, শর্ত ও ব্যর্থতার দায় স্পষ্ট করা জরুরি।

বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনা ও ভূকৌশলগত সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রথমেই মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের অগ্রগতি, বিলম্বের কারণ ও নতুন সময়সীমা প্রতি তিন মাসে জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে গতি আনতে শুল্ক প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন, শ্রম-অসন্তোষের আগাম সমাধান এবং বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বন্দর থেকে কারখানা পর্যন্ত পণ্য পরিবহন দ্রুত ও সাশ্রয়ী করতে ঢাকা এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সঙ্গে কার্যকর রেল ও নৌযোগাযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

পাশাপাশি রপ্তানি বৈচিত্র্য আনতে চামড়া, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আইটি সেবা খাতের জন্য বিশেষায়িত গুদাম ও কোল্ড চেইন সুবিধা গড়ে তুলতে হবে। আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে পরীক্ষামূলক কাস্টমস করিডোর চালু করে আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১০ শতাংশে উন্নীত করার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে সমুদ্র-অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সমুদ্রবিজ্ঞান, জাহাজ প্রকৌশল, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিকসে বিশেষায়িত শিক্ষা সম্প্রসারণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা জরুরি।

স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, 
জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়