ক্ষতির দায় জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার নীতি থেকে সরে আসতে হবে

দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি, খেলাপি ঋণের বিস্তার ও দুর্বল সুশাসনে দেশের ব্যাংক খাতে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে, যার মূল্য দিতে হচ্ছে আমানতকারী ও করদাতাদের। একদিকে ব্যাংকে সঞ্চিত অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, অন্যদিকে আর্থিক খাতের সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের প্রস্তাব সামনে আসছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জানিয়েছেন, ব্যাংক খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর জাতীয় বাজেট থেকে প্রতি বছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। সে হিসাবে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে তিন থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংক খাতের সংকটের জন্য দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা অর্থ কীভাবে উদ্ধার করা হবে কিংবা খেলাপি ঋণ আদায়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনও সুস্পষ্ট কোনো ঘোষণা নেই। অনিয়মের জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে জনগণের করের অর্থ দিয়ে ব্যাংক খাতের ক্ষতিপূরণ করা হলে তা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলতে পারে এবং ভবিষ্যতে অনিয়মের ঝুঁকি বাড়াবে। তাই ক্ষতির দায় জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার নীতি থেকে সরে এসে সংকটের জন্য দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একইসঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায়, আত্মসাৎ করা অর্থ ও সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রয়োজনে সরকারি সহায়তা দেওয়ার যৌক্তিকতা রয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হলে আমানতকারীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি ঋণপ্রবাহ, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আর্থিক খাতের সংকট বৃহত্তর অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ার আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া তাই জরুরি। কিন্তু ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল রাখার প্রয়োজনীয়তা আর ব্যাংকগুলোর অতীতের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার দায় নির্বিচারে রাষ্ট্রের কাঁধে তুলে দেওয়া এক বিষয় নয়। রাষ্ট্রীয় সহায়তার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, কোনোভাবেই অনিয়মের দায়ীদের রক্ষা করা কিংবা ভবিষ্যতে একই ধরনের কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করা নয়।

ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট, খেলাপি ঋণ ও প্রকৃত সম্পদক্ষতি এক বিষয় নয়। কোনো ব্যাংকের সাময়িক তারল্য সংকট দেখা দিলে স্বল্পমেয়াদি তারল্য সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। আবার ঋণ জালিয়াতি ও বিপুল অঙ্কের ঋণ অনাদায়ের কারণে কোনো ব্যাংকের সম্পদমূল্য ও মূলধন ক্ষয়ে গেলে প্রয়োজন হতে পারে পুনর্গঠন, দায় নির্ধারণ, সম্পদ উদ্ধার কিংবা মালিকানা কাঠামোয় পরিবর্তন। সব ধরনের সমস্যার সমাধান একই পদ্ধতিতে করা যায় না। ফলে ব্যাংকভেদে সংকটের ধরন ও গভীরতা নির্ধারণ না করে অভিন্ন অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের নীতি কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম।

ব্যাংক খাতের ক্ষতির দায় শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে। যেসব ব্যাংকে অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে দায়ীদের শনাক্ত ও জবাবদিহির আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অথচ ব্যাংকের ক্ষতি পূরণে করদাতাদের অর্থ ব্যয় করা হলে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কার্যত দায়মুক্তির সুযোগ পেতে পারে। ঋণখেলাপি বা অনিয়মকারীরা যদি মনে করেন, ব্যাংককে ঝুঁকির মুখে ফেলার পরও শেষ পর্যন্ত সরকার অর্থ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেবে, তাহলে ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল আচরণের প্রণোদনা দুর্বল হবে। 

ব্যাংকগুলোর আর্থিক বিবরণীতে প্রদর্শিত সম্পদের মূল্য এবং প্রকৃত আদায়যোগ্য সম্পদের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকতে পারে। ঋণের শ্রেণিবিন্যাস, জামানতের প্রকৃত মূল্য, সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছে বিতরণ করা ঋণ, গোপন দায় এবং সম্ভাব্য ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র নিরূপণ করা ছাড়া প্রকৃত মূলধন ঘাটতি নির্ধারণ সম্ভব নয়। স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য ফরেনসিক নিরীক্ষার মাধ্যমে এসব তথ্য যাচাই করে ব্যাংকভিত্তিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। কোন ব্যাংক পুনর্গঠনের মাধ্যমে টিকে থাকতে পারবে, কোন ব্যাংকের একীভূতকরণ প্রয়োজন এবং কোন ব্যাংককে পুনরুদ্ধার করা অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক— তারও সুস্পষ্ট মূল্যায়ন থাকতে হবে। ব্যাংক পুনরুদ্ধারের নামে জনগণের অর্থ ব্যয় করা হলে সেই অর্থের প্রতিটি টাকার যৌক্তিকতা ও ফলাফল নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষতির দায়ীদের জবাবদিহি, সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং কার্যকর সংস্কারকে অগ্রাধিকার না দিয়ে শুধু অর্থ ঢেলে ব্যাংক খাতকে সুস্থ করা যাবে না।