জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: একজন মানুষ। যার ওয়াজ শুনতে এক সময় লাখো মানুষ মাঠে জমা হতো। যিনি তেরো বছর কারাগারে ছিলেন। আর ২০২৩ সালের এক রবিবার বিকেলে হঠাৎ বুকে ব্যথা নিয়ে তাকে নেওয়া হলো হাসপাতালে। চব্বিশ ঘণ্টা না পেরোতেই এল সেই খবর। সেই রাতে আসলে কী ঘটেছিল? আজ আমরা শুধু প্রমাণিত তথ্য, পরিবারের অভিযোগ আর কর্তৃপক্ষের জবাব পাশাপাশি রাখব। রায় দেবেন আপনি।
দেলওয়ার হোসাইন সাঈদী। ১৯৮০-র দশকে দেশের নামকরা মসজিদগুলোতে ওয়াজ করে তিনি পরিচিত হন। বিশ্লেষকদের মতে, তার বক্তৃতাই জামায়াতে ইসলামীকে বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে ভূমিকা রেখেছে। তিনি সংসদ সদস্যও ছিলেন।
কিন্তু গল্পের আরেকটা দিক আছে, যেটা আমরা চেপে যাব না। ২০১০ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন। ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে হত্যা, ধর্ষণ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের অভিযোগসহ আটটি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তার রায়ের পর সারা দেশে সহিংসতায় একশোর বেশি মানুষ নিহত হয়। পরে সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন।
তার সমর্থকরা বলেন বিচার রাজনৈতিক ছিল। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও ট্রাইব্যুনালের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। সরকার ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, এটাই ন্যায়বিচার। তবে এই বিতর্ক শেষ আজও হয়নি।
রোববার বিকেল প্রায় পাঁচটা। কাশিমপুর কারাগারে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিরাশি বছরের এই বন্দি। বুকে ব্যথা। প্রথমে তাকে নেওয়া হয় গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য। সেখান থেকে সন্ধ্যায় পাঠানো হয় ঢাকায়।
রাত সাড়ে দশটার দিকে তিনি ভর্তি হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বিএসএমএমইউতে।
খবরটি বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। মুহূর্তেই থমকে যায় পুরো দেশ। কোটি কোটি অনুসারীর হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। কী হয়েছে আল্লামা সাঈদীর? তিনি কি বেঁচে আছেন?
এই সময়টা মনে রাখুন। বিকেল পাঁচটা। রাত সাড়ে দশটা। মাঝের এই ঘণ্টাগুলো নিয়েই পরে প্রশ্ন উঠবে।
সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজাউর রহমান জানান, মাওলানা সাঈদীর আরেকটি হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। আর তারপর রাত ৮টা ৪০ মিনিটে, চিকিৎসকরা তার মৃত্যু ঘোষণা করেন। হাসপাতালের ভাষ্য অনুযায়ী, আগেই তার হৃদযন্ত্রে পাঁচটি স্টেন্ট বসানো ছিল।
কারা কর্তৃপক্ষ বলল, হৃদরোগে মৃত্যু। হাসপাতাল বলল, হার্ট অ্যাটাক। সরকারি ভাষ্য এখানেই স্পষ্ট।
কিন্তু একটু পরেই অন্য একটি ভাষ্য সামনে এল।
মৃত্যুর খবর প্রথম প্রকাশ করে জামায়াতে ইসলামী, নিজেদের ফেসবুক পেজে। সেখানে তারা সঙ্গে সঙ্গেই অভিযোগ করে, কারাগারে বিনা চিকিৎসায় ধীরে ধীরে তাকে ‘শহীদ’ করে দেওয়া হয়েছে। বিএনপিও এই প্রথম কোনো দণ্ডিত জামায়াত নেতার মৃত্যুতে শোক জানায়। দলটির মহাসচিব বলেন, এগুলো অভিযোগ। প্রমাণিত সত্য নয়। এখানে আমরা এগুলো রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই উপস্থাপন করছি।
পরিবার কী বলেছে, সেটা আপনি তাদের নিজেদের ভাষায়ই দেখুন। আমরা বাড়িয়ে বলব না।
আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মৃত্যুর পর বিএসএমএমইউ একটি বিবৃতি দেয়। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রটোকল মেনেই চিকিৎসা হয়েছে। তারা আরও বলে, রোগের প্রকৃতি ও সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে তার ছেলে মাসুদ সাঈদী অবগত ছিলেন।
বিবৃতির পেছনে একটি ঘটনা ছিল। চিকিৎসক দলের একজন পুলিশের কাছে সাধারণ ডায়েরি করেন। তার অভিযোগ, সাঈদীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তিনি হুমকি পাচ্ছেন। এই ঘটনার সূত্র ধরে সামাজিক মাধ্যমের কিছু প্রোফাইলও পুলিশকে জানানো হয়।
অর্থাৎ একদিকে পরিবার ও দল প্রশ্ন তুলছে। অন্যদিকে একজন চিকিৎসক নিজেই আতঙ্কে। দুই পক্ষই নিজেদের ভয় ও ক্ষোভ নিয়ে দাঁড়িয়ে।
হাসপাতালের সামনে হাজারো মানুষ জড়ো হলেন। কেউ তার ওয়াজের ক্যাসেট শুনে বড় হয়েছেন। কেউ ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে মাঠে বসে শুনেছেন তার কণ্ঠ। কণ্ঠে 'আল্লাহু আকবার' ধ্বনি। পুলিশের বিশাল উপস্থিতি।
একজন মানুষের মৃত্যুতে এত অশ্রু, এত নীরব দাঁড়িয়ে থাকা। তার অনুসারীদের কাছে তিনি ছিলেন প্রিয় ওয়ায়েজ, ঈমানের পথপ্রদর্শক। এই আবেগ বাস্তব। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
আবার আরেক দিকে আছেন সেই পরিবারগুলো, যারা ১৯৭১ সালে স্বজন হারিয়েছেন এবং আদালতের রায়ে ন্যায়বিচারের আশা করেছিলেন। তাদের শোকও কম বাস্তব নয়। একই মৃত্যুতে দুই ধরনের অনুভূতি, এই ভাগাভাগি আমাদের সমাজের গভীর ক্ষত।
আল্লামা সাঈদীর মৃত্যুর পর ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়। ঢাকায় পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়, যাদের মধ্যে তার ছেলে মাসুদও ছিলেন।
মৃত্যুর পর একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পাওনা হলো তার জানাজা ও শেষ বিদায়। কিন্তু আল্লামা সাঈদীর ক্ষেত্রে সেখানেও নেমে আসে চরম নাটকীয়তা। ঢাকায় তার জানাজা পড়তে চেয়েছিল লাখো মানুষ। কিন্তু নিরাপত্তার অজুহাতে গভীর রাতে কড়া পাহারায় তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় নিজ জন্মস্থান পিরোজপুরে।
ঢাকায় জানাজার দাবিতে অবস্থান নেওয়া সাধারণ মানুষের ওপর নেমে আসে পুলিশি অ্যাকশন। কাঁদুনে গ্যাস আর সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দে ভারী হয়ে ওঠে মধ্যরাতের ঢাকা। যে মানুষটি তার সুমধুর কণ্ঠে বছরের পর বছর মানুষকে কোরআনের আলোয় আলোকিত করেছেন, তার শেষ বিদায়বেলায় কেন এই নিষ্ঠুরতা? পরিবারের সদস্যদের আর্তনাদ আর সোশ্যাল মিডিয়ায় সাধারণ মানুষের আক্ষেপ যেন আকাশ ছুঁয়ে যায়।
সংবাদমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, তিরাশি বছরের একজন বন্দি হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন, আর হাসপাতাল বলছে চিকিৎসা প্রটোকল মেনেই হয়েছিল। অভিযোগ বলছে, কারাগারে তাকে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। যে কোনো বন্দির মৃত্যুতে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত পাওয়া তার পরিবারের ন্যায্য প্রত্যাশা। আর যারা ভুক্তভোগী, তাদের ন্যায়বিচারের প্রশ্নও থেকে যায়।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি
