সৈয়দ ইকবাল, ঢাকা: রাতের নীরবতায় যখন সড়কে কমে আসে ব্যক্তিগত গাড়ির চলাচল তখনও থেমে থাকে না ইট-বালুবাহী ট্রাক, নির্মাণসামগ্রীর পরিবহনসহ সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি ও নানা ধরনের উন্নয়নকাজ। এতে রাতে দূষণ বাড়ছে রাজধানীতে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রাত ৯টার পর থেকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণসামগ্রীর ট্রাক ঢুকতে থাকে। ঢাকার আশপাশ থেকে আসা ইট-বালু, রড সিমেন্টসহ মাটির ট্রাকও থাকে। রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানী, বারিধারাসহ ডিপ্লোমেটিক জোনে ইট-বালু ও মাটির ট্রাক অনেকটা নিয়মনীতি মেনে অর্থাৎ প্লাস্টিক দিয়ে ঢেকে পণ্য আনা-নেওয়া করলেও অন্য এলাকাগুলোতে তা মানা হয় না। এসব এলাকায় বালু-ইট রাস্তায় রাখার সময় পাটের চট বিছিয়ে তার ওপর নির্মাণসামগ্রী রাখা হয়।
রামপুরা, বাড্ডা, মিরপুর, পুরান ঢাকা, মুগদা, মান্ডা, খিলগাঁও, মানিকনগর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, মাতুয়াইল, কোনাপাড়া, শনিরআখড়া, ধোলাইপাড়, ধনিয়া, শ্যামপুর, জুরাইন-পোস্তগোলা, দক্ষিণখানের আশপাশ এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে সেখানে নিয়ম তো মানাই হয় না বরং রাত হলেই অনেক গতিতে ইট-বালু, রড-সিমেন্ট ও মাটি নেওয়ার গাড়ি ছুটে চলায় রাস্তায় ধুলার পরিমাণ বাড়তে থাকে। সড়কের পাশে জমে থাকা মাটি-বালু এবং নির্মাণস্থলের সূক্ষ্ম কণা মিশে ভারী করে তোলে ঢাকার বাতাস। শীতের আগেই দূষণের এই দাপটে রাজধানীর বাতাস জনস্বাস্থ্যের জন্য বেশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যাটমোস্ফেরিক পলিউশন স্টাডিজের (ক্যাপস) ঢাকার বায়ুমান সূচকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখেছে, বিকাল ৪টার পর থেকে দূষণ বাড়তে শুরু করে এবং রাত ১১টা থেকে রাত ২টার মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাত ১টার পর থেকে বায়ুমান সূচক ১৬২ থেকে উপরের দিকে যায়। গবেষকদের মতে, রাতে পণ্যবাহী ভারী যানবাহনের চলাচলসহ বিভিন্ন কারণে দূষণ বাড়ে। অথচ দিনের নির্দিষ্ট সময়ের বায়ুমান দিয়ে পুরো দিনের দূষণ পরিস্থিতি তুলে ধরা হলে রাতের দূষণের তীব্রতা আড়ালে থেকে যায়।
এদিকে বায়ুমান সূচকের সাম্প্রতিক তথ্যে পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গত ৬ অক্টোবর ঢাকার বায়ুমান সূচক (একিউআই) ২১৩-তে উঠেছিল যা ‘অতি অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ের মধ্যে পড়ে। ৭ অক্টোবর সকালে সূচক ছিল ১৭৩, ১২ অক্টোবর ১৬৭, ১৬ অক্টোবর ছিল ১৮১, ১৮ অক্টোবর ১৭৭ এবং আর ২১ অক্টোবর রাত ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে সূচক ছিল ১৭০। অর্থাৎ পর্যবেক্ষণ করা দিনগুলোতে ঢাকার বাতাস অস্বাস্থ্যকর পর্যায়েই ছিল; একদিন সূচক ২০০ ছাড়িয়ে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়েছে।
ঢাকার বায়ুমান সূচকে কখনও কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও দূষণের সামগ্রিক চাপ থেকে মুক্তি মিলছে না নগরবাসীর। বিশেষ করে সড়কের পাশে থাকা আবাসিক ভবনে বসবাসকারীসহ শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও শ্বাসতন্ত্রের রোগীরা রয়েছেন বাড়তি ঝুঁকিতে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, শীত বা শুষ্ক মৌসুমে রাতে ঢাকার বাতাসে পিএম ২ দশমিক ৫-এর গড় ঘনত্ব ২১৬ মাইক্রোগ্রাম, যা সংস্থাটির ২৪ ঘণ্টার নির্দেশিত সীমার প্রায় ১৪ গুণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাতাসের এই সূক্ষ্ম কণা ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে শ্বাসকষ্টসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে বয়স্ক ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি শ্বাসজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
রাজধানীর খিলাগাঁও মূল সড়কের পাশে অনেক বছর ধরে বসবাস করা বেসরকারি চাকরিজীবী খসরু নোমান জানান, গত কয়েক বছর ধরে তার ও তার পরিবারের লোকজনের শ্বাসকষ্টসহ সর্দি-কাশি লেগেই থাকে। শীত আসলে এটার পরিমাণ বাড়ে। বাসা রাস্তার পাশে হওয়ায় রাত হলে ইট-বালু ও মাটির ট্রাক যাওয়া-আসা এবং রাস্তা কাটাকাটিতে বারান্দায়-রুমে প্রচুর ধুলা দেখা যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ঘরের বাইরের পিএম২ দশমিক ৫ ঘরেও ঢোকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযয়ের পরিবেশ বিভাগের এক গবেষণায় একটি ঘরের ভেতরের বাতাস পরীক্ষা করে দেখেছে, দূষণের দিনে ঘরের ভেতরেও পিএম২ দশমিক ৫ সীমার নয় গুণ। সেই বাতাসের ধাতু ক্যানসারের ঝুঁকিও সীমার ওপরে।
ব্র্যাকের জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের এক গবেষণায় ঢাকার শ্যামপুরে বায়ুদূষণে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে শ্বাসতন্ত্রের রোগের উপসর্গ পাওয়া গেছে। গবেষণায় দক্ষিণখান এলাকায় ৫৫ দশমিক ৪১ শতাংশ শ্বাসতন্ত্রের রোগের উপসর্গের কথা বলা হয়েছে। ওই গবেষণায় বায়ুর সূক্ষ্ম দূষণকণা বৃদ্ধির সঙ্গে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় জরুরি বিভাগে রোগী আসার হার বৃদ্ধির কথাও উল্লেখ করা হয়। গবেষণায় শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হওয়ার প্রমাণও উঠে এসেছে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় ঢাকার ২৪টি স্থানে করা বায়ুমান পরিমাপে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের উচ্চমাত্রা পাওয়ার তথ্য জানানো হয়। যেখানে নগরীর গুলিস্তানে সালফার ডাই-অক্সাইডেরও উল্লেখযোগ্য মাত্রা বেশির কথা বলা হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দিন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, শুষ্ক মৌসুমে ঢাকার বাতাস নানাভাবে দূষিত হওয়ার মাত্রা বাড়ে। একদিকে শহরের উত্তর দিকে থাকা ইটভাটাগুলো থেকে দূষিত বাতাস আসা অন্যদিকে নির্মাণ কাজসহ ইট-বালু-মাটির গাড়ি চলাচলে রাস্তার পাশে থাকা বাসিন্দাদের শ্বাসকষ্টসহ ঠান্ডাজনিত সমস্যা হওয়াটা স্বাভাবিক।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও আইপিডির নির্বাহী ড. আদিল মুহাম্মদ খান জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘রাতে ঢাকায় বায়ুদূষণ বাড়ার অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম হলো- ইট, বালু ও মাটির গাড়ি চলাচলসহ অনিয়ন্ত্রিত কনস্ট্রাকশন ও রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ। পাশাপাশি, রাতে ঢাকার ভেতর দিয়ে প্রচুর দূরপাল্লার বাস এবং বিশেষ করে পণ্যবাহী ভারী ট্রাক চলাচল করে। অন্যদিকে রাতে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা কম থাকায় ধূলিকণাগুলো বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে উঠে যেতে পারে না। ফলে এগুলো একটি নির্দিষ্ট স্তরে আটকে পড়ে এবং বায়ুদূষণের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এ অবস্থায় রাতে শহরের ভেতর চলাচলকারী পণ্যবাহী গাড়িগুলোকে নিয়ন্ত্রণসহ দূষণ কমানোর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।’