আকাশ চন্দ্র দাস: নিজের একটি ফ্ল্যাট মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত, অনেক মানুষের কাছেই জীবনের অন্যতম বড় স্বপ্ন। দীর্ঘদিনের সঞ্চয়, ব্যাংকঋণ কিংবা পরিবারের আর্থিক সহযোগিতায় মানুষ একটি স্থায়ী ঠিকানা গড়ে তোলেন। কিন্তু আবেগের বশে কিংবা আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দেখে ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত নিলে ভবিষ্যতে আর্থিক ক্ষতি, আইনি জটিলতা ও নানা ধরনের ভোগান্তিতে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ফ্ল্যাট কেনার আগে দাম ও অবস্থানের পাশাপাশি জমির বৈধতা, নির্মাণের অনুমোদন, ভবনের নিরাপত্তা, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সুনাম এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় যাচাই করা জরুরি।
ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলো জমির মালিকানা। জমির দলিল, খতিয়ান, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ড যাচাই করতে হবে। জমিটি নিয়ে কোনো মামলা, বিরোধ, বন্ধক বা তৃতীয় পক্ষের দাবি রয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। যৌথ মালিকানাধীন জমিতে নির্মিত প্রকল্পের ক্ষেত্রে জমির মালিকদের সঙ্গে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের চুক্তি এবং ফ্ল্যাট বিক্রির আইনগত অধিকার পরীক্ষা করা উচিত। একটি ফ্ল্যাট কেনার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নকশা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবনের উচ্চতা, সেটব্যাক, পার্কিং, সিঁড়ি, লিফট ও অন্যান্য সুবিধা অনুমোদিত নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেগুলোও পরীক্ষা করতে হবে। রাজধানী ঢাকায় প্রকল্পের অবস্থান অনুযায়ী রাজউক বা সংশ্লিষ্ট অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের নথি যাচাই করা উচিত। নির্মাণ শেষ হয়ে থাকলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট বা ব্যবহার অনুমোদনসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্রও দেখতে হবে।
ফ্ল্যাটের বিজ্ঞাপন, সাজানো অফিস কিংবা আকর্ষণীয় প্রতিশ্রুতি দেখেই ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখা উচিত নয়। প্রতিষ্ঠানটি কত বছর ধরে কাজ করছে, পূর্ববর্তী প্রকল্প সময়মতো হস্তান্তর করেছে কি না, নির্মাণের মান কেমন এবং গ্রাহকদের অভিযোগ রয়েছে কি না, এসব তথ্য যাচাই করা দরকার। সম্ভব হলে আগের প্রকল্পগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করে বসবাসরত ফ্ল্যাট মালিকদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তাদের কাছ থেকে পানি ও গ্যাসের সুবিধা, লিফটের কার্যকারিতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং হস্তান্তর-পরবর্তী সেবার অভিজ্ঞতা জানা যেতে পারে।
ফ্ল্যাটের সৌন্দর্য নয়, ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তাই হওয়া উচিত ক্রেতার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। ভবনের ভিত্তি, কলাম, বিম, স্ল্যাব, রড ও কংক্রিটের মানসহ প্রাসঙ্গিক প্রকৌশলগত বিষয়গুলো যোগ্য প্রকৌশলীর মাধ্যমে মূল্যায়ন করা উচিত। এছাড়া অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সিঁড়ি, লিফটের নিরাপত্তা এবং প্রযোজ্য ভূমিকম্প সহনশীল নকশার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে। শুধু ভবন বাইরে থেকে সুন্দর দেখালেই সেটিকে নিরাপদ বলা যায় না।
ফ্ল্যাটের অবস্থান আমাদের জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাই কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাজার, গণপরিবহন এবং প্রধান সড়কের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা কেমন, তা যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এলাকায় জলাবদ্ধতা, বর্ষাকালে পানি জমার প্রবণতা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, রাস্তার অবস্থা, বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সুবিধা সম্পর্কে খোঁজ নিতে হবে। দিনের পাশাপাশি সন্ধ্যায় বা ব্যস্ত সময়ে এলাকাটি পরিদর্শন করলে যানজট, শব্দদূষণ ও পরিবেশ সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা আয়তন এবং বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য জায়গার মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। চুক্তির আগে ফ্ল্যাটের মোট ও ব্যবহারযোগ্য আয়তন, বারান্দা এবং সিঁড়ি, লিফট লবি ও অন্যান্য কমন স্পেসের হিসাব স্পষ্টভাবে জেনে নিতে হবে। সম্ভব হলে নকশার সঙ্গে বাস্তব মাপ মিলিয়ে দেখতে হবে। ফ্ল্যাট কেনার সময় নিবন্ধন-সংক্রান্ত ব্যয়, প্রযোজ্য কর ও ফি, ইউটিলিটি সংযোগ, পার্কিং, সার্ভিস চার্জ, সমিতির প্রাথমিক তহবিল এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। পার্কিংয়ের দাম মূল দামের অন্তর্ভুক্ত কি না, লিফট ও জেনারেটরের ব্যয় কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কত হতে পারে, এসব বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা নেওয়া জরুরি। সব ব্যয় মিলিয়ে মোট বাজেট নির্ধারণ করলে পরবর্তী সময়ে আর্থিক চাপে পড়ার ঝুঁকি কমে।
ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে ফ্ল্যাট কেনার পরিকল্পনা থাকলে সুদের হার, ঋণের মেয়াদ, মাসিক কিস্তি, প্রসেসিং ফি এবং আগাম ঋণ পরিশোধের শর্ত যাচাই করতে হবে। মাসিক আয়ের সঙ্গে কিস্তির সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি। এছাড়া ফ্ল্যাটের মালিকানা বা প্রকল্পের জমি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বন্ধক রাখা আছে কি না, তা যাচাই করা উচিত। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বন্ধকমুক্তির ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন সম্পর্কে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।
প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, নেক্সসফেয়ার