খরচ বেড়েছে ১০ পয়সা, অসাধু ব্যবসায়ীরা বাড়ালেন ১৫ টাকা

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ছোলাবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করার পর এসব ছোলা চট্টগ্রামসহ সারা দেশে সরবরাহ করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয় জ্বালানি তেলের দাম। সেই হিসাবে বন্দর থেকে খাতুনগঞ্জে ছোলা আসতে কেজিতে বাড়তি খরচ ১০ পয়সার বেশি না। অথচ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাত খাতুনগঞ্জে ছোলায় কেজিতে দাম বাড়ানো হয় ১৪ থেকে ১৫ টাকা। 

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ছোলা আমদানি হয়েছে ২ লাখ ২৭ হাজার ৩৫৫ মেট্রিক টন। অর্থাৎ মাসে গড়ে আমদানি ১৮ হাজার ৪৭৬ মেট্রিক টন। আর গত অর্থবছরে তিন মাসে আমদানি হয়েছে ৫৯ হাজার ২৭৯ মেট্রিক টন, যা স্বাভাবিক আমদানির চেয়েও বেশি। অথচ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে কেজিতে দাম বাড়ানো হয় ১৪ থেকে ১৫ টাকা করে।

মূলত রোজাকে সামনে রেখে ছোলার বাজারেও অসাধু ব্যবসায়ীরা তৈরি করেছে অস্থিরতা। কয়েক দিনের ব্যবধানে ভালো মানের ছোলার দাম কেজিতে ১৪ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। এতে প্রতি মণের (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) দাম বেড়েছে ৫০০ টাকার বেশি। 

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দেশে ছোলার কোনো সংকট না থাকলেও মজুদ ও ট্রেডিংয়ের কারণে দাম বাড়ছে। দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকা পণ্য ধারাবাহিকভাবে ক্রয়ের পর বড় মজুদ নিশ্চিত হলেই কয়েকজন ব্যবসায়ী মিলে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়িয়ে দেন। একইসঙ্গে চাল, ডাল, গম, তেল, চিনি ও মসলাসহ ভোজ্যতেলের পাইকারি বাজার এখন এক ধরনের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

অপরদিকে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পণ্য পরিবহনে কিলোমিটারে বাস ও ট্রাক ভাড়া ১৭ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। সেই হিসাবে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সড়ক পথে খাতুনগঞ্জের দূরত্ব সাড়ে আট কিলোমিটার। ফলে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয় বেড়েছে এক টাকা ৪৫ পয়সা। একটা গাড়ি কমে ১২ টন পণ্য পরিবহন করে। এসব বিবেচনায় কেজিতে ১০ পয়সাও বাড়েনি খরচ।

ব্যবসায়ীরা বলেন, দেশের বাজারে দীর্ঘদিন স্থিতিশীল থাকার পর সম্প্রতি বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। এর সরাসরি প্রভাবে হুহু করে বাড়ছে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে দেখা দেয় জ্বালানি সংকট। ফলে বিশ্বজুড়ে শিপিং চার্জ বৃদ্ধি ও পণ্য সরবরাহে বিলম্ব ঘটে। এর সরাসরি প্রভাবে দেশে জ্বালানির দাম সমন্বয় করায় স্থানীয় পরিবহন ও উৎপাদন খরচ অনেকটাই বেড়ে যায়। ফলে সয়াবিন, পাম অয়েল, গম, চিনি, চাল ও মসলার বাজারেও দাম বাড়ছে দ্রুতগতিতে। মূলত  রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে। চাল, ডাল, গম, চিনি ও মসলাসহ ভোজ্যতেলের পাইকারি বাজার এখন এক ধরনের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আসন্ন রমজানকে ঘিরে অসাধু ব্যবসায়ীদের মজুদপ্রবণতা এবং স্লিপ ও ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) বেচাকেনার কারণে নিত্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে।

দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে গতকাল খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক দিনের ব্যবধানে মটর বা বুটের ডালের দাম কেজিপ্রতি ৪ থেকে ৫ টাকা এবং এলাচের দাম কেজিতে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতার কারণে এলাচ এখন খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকায়। বিশ্ববাজারে দাম না বাড়লেও কেবল স্থানীয় ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে সিন্ডিকেট করে কৃত্রিমভাবে মসলাটির দাম বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ সাধারণ ব্যবসায়ীদের।

ডাল ব্যবসায়ীরা জানান, কয়েক বছর ধরে ডলার সংকট, ব্যাংকে ঋণপত্র খুলতে সমস্যা, ঋণপত্রের মার্জিন জটিলতায় আমদানিতে বড় ধরনের সংকটে ছিলেন ব্যবসায়ীরা। সাম্প্রতিক সময়ে ডলার সংকট কেটে যাওয়া এবং ব্যাংকে ঋণপত্র (এলসি) খোলা তুলনামূলক সহজ হয়েছে। তবে অন্যান্য পণ্যের চাহিদা কমলেও ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দা পরিস্থিতিতেও ভোগ্যপণ্যের চাহিদা প্রতিদিনই বাড়ছে। যার কারণে দামও বাড়ছে। নিত্যপণ্যের আমদানি, উৎপাদন ও বিপণনে সরকারিভাবে মনিটরিং জোরদার করা এবং আমদানি শুল্কে ছাড় না দিলে এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা রোধ করা কঠিন হবে।

জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জের ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রচার সম্পাদক ও গম আমদানিকারক ফরিদুল আলম বলেন, ‘বিশ্ববাজারে জাহাজ ও কনটেইনার ভাড়া দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। এছাড়া পণ্য আসতেও সময় লাগছে। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ভালো না। ফলে ব্যবসায়ীরা অনেকটা আমদানি কমিয়েছে। এছাড়া দেশে একাধিক বার তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ব্যয় বেড়েছে। এ কারণে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে, যা স্বাভাবিক; কিন্তু প্রতি লিটার জ্বালানির মূল্য ২০ টাকা বাড়ার পর পণ্যের দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়ে যাওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।’

খাতুনগঞ্জের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী জানান, ‘ভোগ্যপণ্যের বাজারে সবচেয়ে বড় সংকট এখন ট্রেডিং। পণ্য মজুদ না থাকলেও এলসির বিপরীতে বাড়তি পণ্য বিক্রি এখন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। স্লিপ বা ডিও বাণিজ্যের কারণে পণ্যের দাম শেয়ারবাজারের মতো ওঠানামা করানো হচ্ছে। ফলে খুচরা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা।’

এ বিষয়ে খাতুনগঞ্জ সাধারণ আড়তদার সমিতির সাধারণ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, বাজারে হঠাৎ করে ছোলার দাম বেড়েছে। মণপ্রতি ৫০০ টাকা বাড়ছে। অথচ আমদানি স্বাভাবিক আছে। যদিও মৌসুম শেষ এখন বাজারে ছোলার চাহিদা একটু বাড়ছে। কিন্তু দেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি চেয়েও ছোলার দাম বৃদ্ধি অস্বাভাবিক। এসব বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হোক।