সরকারি সংস্থায় ডিপসিক নিষিদ্ধ করল যুক্তরাষ্ট্র

প্রযুক্তি ডেস্ক : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে এবার জড়িয়ে পড়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাত। জাতীয় নিরাপত্তার মারাত্মক ঝুঁকি ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচারের আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের সব বেসামরিক সরকারি সংস্থার আইটি সিস্টেমে চীনা এআই ‘ডিপসিক’ এর তৈরি সব ধরনের প্রযুক্তি ও সেবা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। 

হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) কর্তৃক জারি করা এই আদেশ অনুযায়ী, অর্থ, পররাষ্ট্র ও বিচার বিভাগসহ মার্কিন সরকারের সব বেসামরিক সংস্থাকে তাদের বর্তমান প্রযুক্তিগত কাঠামো থেকে ডিপসিক সংক্রান্ত সব ধরনের সফটওয়্যার ও সার্ভিস অবিলম্বে অপসারণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে চীনা এই স্টার্টআপটির মডেল বা লজিক ব্যবহার করে থার্ড-পার্টি কোনো প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা পণ্য ও সেবার ওপরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সরকারিভাবে ডিপসিকের কোনো নতুন পরিষেবা ক্রয় বা সংগ্রহ করাও পুরোপুরি বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে দপ্তরটি। 

মার্কিন প্রশাসনের এই পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে বেইজিং। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, চীন সব সময়ই বাণিজ্য ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি খাতকে রাজনৈতিক হাতিয়ার করা এবং জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত তুলে অতিরিক্ত কড়াকড়ি আরোপের বিরোধিতা করে এসেছে। চীনা প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় বেইজিং প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের মতে, ডিপসিকের এআই মডেলগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বহুমুখী হুমকি তৈরি করছে। মার্কিন সরকারি কর্মকর্তা বা ঠিকাদাররা ডিপসিক ব্যবহার করলে তা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মসূচি এবং সংবেদনশীল জাতীয় তথ্য সরাসরি চীনে পাচার হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছে প্রশাসন। এছাড়া গবেষকদের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে ডিএইচএস আরও জানায়, ডিপসিকের বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন ও মডেলের সুরক্ষায় একাধিক সাইবার নিরাপত্তা ত্রুটি ও ক্ষতিকর ‘মালওয়্যার’ ব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। 

২০২৫ সালে কম খরচে বিশ্বমানের ওপেন সোর্স মডেল নিয়ে এসে বৈশ্বিক বাজারে হইচই ফেলে দিয়েছিল চীনা স্টার্টআপ ডিপসিক। এর পর পরই মার্কিন সরকারের বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থা এই প্রযুক্তির ওপর নজরদারি ও কড়াকড়ি বাড়াতে শুরু করে। ওই বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের আওতাধীন ‘ডিফেন্স ইনফরমেশন সিস্টেমস এজেন্সি’ এবং মার্চ মাসে বাণিজ্য বিভাগ নিজস্ব ডিভাইসে ডিপসিকের ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। পরবর্তী সময় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নেটওয়ার্কে ডিপসিক ব্যবহারে আইনি বিধিনিষেধ আরোপ করে দেশটির কংগ্রেস। 

বর্তমানে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের জারি করা সর্বশেষ এই নির্দেশনার মাধ্যমে বেসামরিক প্রশাসন থেকে চীনা এই এআই হাবকে এক প্রকার সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলো। তবে মার্কিন সামরিক দপ্তর পেন্টাগন বা প্রতিরক্ষা বিভাগকে আপাতত এই নির্দেশের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে পর্যালোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হতে পারে। কোনো বিশেষ প্রয়োজনে নির্দিষ্ট কোনো সংস্থা এই নিষেধাজ্ঞার ব্যাতিক্রম চাইলে আদেশ জারির ৬০ দিনের মধ্যে যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যাসহ ডিএইচএসের কাছে আবেদন জানাতে পারবে।

বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের নেতৃত্ব কার দখলে থাকবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নাকি চীন—তা নিয়ে শুরু হওয়া দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বকে নতুন করে উসকে দিল ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্ত।