করের চাপে নগদ অর্থ সংগ্রহের হিড়িক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিদেশের আয়ের হিসাব জমা দেওয়ার সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় চীনের ধনকুবেরদের মধ্যে তৎপরতা বেড়েছে। করের দায় মেটাতে কেউ বিদেশে গড়ে তোলা ট্রাস্ট বন্ধ করছেন, কেউ শেয়ার বিক্রি করছেন, আবার কেউ কেউ নাগরিকত্বও পরিবর্তন করছেন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সম্পদ ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ তথ্য জানিয়েছেন।

রয়টার্স জানায়, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি অভ্যন্তরীণ চাহিদার ধারাবাহিক দুর্বলতা ও অর্থনীতির নানা ভারসাম্যহীনতার সঙ্গে লড়াই করছে। একই সময়ে মূলধন বিদেশে স্থানান্তরের ওপর নজরদারি এবং আইন প্রয়োগ আরও কঠোর করার অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্বসংক্রান্ত চাপও বাড়ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ধনীদের আয়ের তথ্য সংগ্রহে কর কর্মকর্তারাও তৎপরতা বাড়িয়েছেন। বিদেশে অর্জিত আয়ের ওপর প্রাপ্য কর আদায়ের জন্য বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ দল গঠন করা হচ্ছে।

হংকং ও যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত চীনা কোম্পানিগুলোর প্রতিষ্ঠাতারা এই নতুন করব্যবস্থার কারণে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারেন। সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান জেএলটি লিগ্যাসি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অস্কার লিউ বলেন, ২০১৪ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এ প্রতিষ্ঠাতাদের অনেকে শেয়ারের সর্বোচ্চ মূল্য থাকার সময় ট্রাস্টের মাধ্যমে শেয়ার বিক্রি করেছিলেন।

লিউ বলেন, ‘আমাদের ধারণা, একটি মামলাতেই কয়েক মিলিয়ন ইউয়ান থেকে শুরু করে কয়েক শ’ মিলিয়ন, এমনকি কয়েক বিলিয়ন ইউয়ান পর্যন্ত কর দিতে হতে পারে।’ হংকং ও সিঙ্গাপুরে কার্যালয় রয়েছে লিউয়ের প্রতিষ্ঠানের।

গত জুলাইয়ের শেষের দিকে বিদেশে গঠিত ট্রাস্ট থেকে অর্জিত আয়ের হিসাব জমা দেওয়ার জন্য ২২ অক্টোবর পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করে বেইজিং। এসব আয়ের ওপর ২০ শতাংশ কর আরোপের বিধান ধনীদের মধ্যে ব্যাপক তৎপরতা সৃষ্টি করেছে। সম্ভাব্য করের পরিমাণ নির্ধারণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন তারা।
বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের হিসাব অনুযায়ী, চীনের নাগরিকদের বিদেশে থাকা সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশে গঠিত ট্রাস্ট জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বিদেশি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত চীনা কোম্পানির বড় শেয়ারধারীরা দেশের বাইরে সম্পদ সংরক্ষণের জন্য এসব ট্রাস্ট ব্যবহার করছেন।

চীনের রাষ্ট্রীয় কর প্রশাসন কর্মকর্তাদের বিদেশে গঠিত ট্রাস্টের কর আদায়ে তৎপর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তিনজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, হুরুনের ধনকুবেরদের তালিকা, কোম্পানির নথিপত্র এবং অন্যান্য প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য করদাতাদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে।

গোপনীয়তার কারণে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ওই ব্যক্তিরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।

লিউ আরও জানান, ধনী উদ্যোক্তার সংখ্যা বেশি এমন কয়েকটি প্রদেশ ও শহরে বিদেশি ট্রাস্ট সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে।
চীনের মন্ত্রিসভা স্টেট কাউন্সিল এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্য চাওয়ার অনুরোধে সাড়া দেয়নি। রাষ্ট্রীয় কর প্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ও মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।

হঠাৎ ট্রাস্টের ওপর কর আরোপের উদ্যোগ কিছু ধনীর মধ্যে নগদ অর্থ সংগ্রহের তাড়াহুড়ো সৃষ্টি করেছে।

একজন পারিবারিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত আইনজীবী জানান, তার মক্কেলরা শেয়ারের দাম কমে যাওয়ার ক্ষতি দেখিয়ে করের দায় কমাতে পারছেন না। অন্যদিকে অতীতে বিপুল লভ্যাংশ পাওয়া আবাসন খাতের কিছু ব্যবসায়ী এখন আর্থিকভাবে এতটাই দুর্বল যে তাদের পক্ষে বকেয়া কর পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর পেছনে রয়েছে আবাসন খাতের দীর্ঘস্থায়ী মন্দা।

প্রযুক্তি খাতের এক ধনকুবেরের পারিবারিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, এখন তাদের ব্যবসায়িক সময়ের বড় অংশই ব্যয় হচ্ছে করের হিসাব-নিকাশে, শেয়ার কেনাবেচায় নয়। করের অর্থ জোগাড় করতে তারা নিজেদের শেয়ার বিনিয়োগের প্রায় অর্ধেক বিক্রি করছেন।

ওই কার্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন বলেন, ‘এটা যেন পায়ের নিচ থেকে মাটি সরিয়ে নেওয়ার মতো।’ তিন মাসের মধ্যে নগদ অর্থে কর পরিশোধের নির্দেশ প্রসঙ্গে তিনি এ কথা বলেন।

একটি বড় আন্তর্জাতিক ব্যাংকের ধনী গ্রাহক ও পারিবারিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা কার্যালয়গুলোর সঙ্গে কাজ করেন এমন একজন প্রাইভেট ব্যাংকার জানান, কর পরিশোধের অর্থ জোগাড় করতে ব্যাংকগুলো এখন ধনী গ্রাহকদের ঋণ দিচ্ছে। এসব ঋণের জামানত হিসেবে রাখা হচ্ছে গ্রাহকদের নিজস্ব কোম্পানির শেয়ার।
বিদেশে গঠিত ট্রাস্টের ওপর চীনের নতুন করব্যবস্থা ধনীদের ব্যবসা ও পারিবারিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার কাঠামো পুনর্গঠনেও বাধ্য করছে। হংকংয়ের একজন ট্রাস্ট আইনজীবী জানান, কেউ কেউ নতুন ট্রাস্ট গঠন করেও তাতে সম্পদ স্থানান্তরের আগেই তা বন্ধ করে দিয়েছেন।