ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় প্রত্ন-পর্যটনের অপার সম্ভাবনা
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

ড. মো. আতাউর রহমান

বাংলাদেশের মাটির নিচে যেমন ইতিহাস ঘুমিয়ে আছে, তেমনি মাটির ওপর ছড়িয়ে আছে সেই ইতিহাসের অসংখ্য দৃশ্যমান সাক্ষ্য। মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর, ময়নামতি, ওয়ারী-বটেশ্বর, বাগেরহাট, সোনারগাঁও, বিক্রমপুর কিংবা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা মসজিদ, মন্দির, বিহার, দুর্গ, প্রাচীন নগর ও বসতির ধ্বংসাবশেষ—এসব কেবল ইট-পাথরের পুরোনো স্থাপনা নয়। এগুলো হাজার বছরের জনপদ, বাণিজ্য, ধর্ম, শিল্প, স্থাপত্য, প্রযুক্তি ও মানুষের অভিযাত্রার জীবন্ত দলিল।

বাংলাদেশে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় বর্তমানে ৫৫৫টি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি রয়েছে (যদিও বেসরকারি গবেষণায় ওঠে এসেছে  বাংলাদেশে পুরাকীর্তির সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারের উর্ধ্বে)। এর মধ্যে পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার ও ঐতিহাসিক মসজিদের শহর বাগেরহাট ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত সাংস্কৃতিক সম্পদ। পাশাপাশি মহাস্থান ও করতোয়া নদীকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্য, লালমাই-ময়নামতির প্রত্নস্থলসহ বাংলাদেশের আরও ১০টি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও প্রত্নসম্পদ ইউনেসকোর World Heritage Tentative  List-এ রয়েছে।

অর্থাৎ আমাদের হাতে সম্পদ আছে, ইতিহাস আছে, গল্প আছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আমরা কি প্রযুক্তির মাধ্যমে এই হাজার বছরের গৌরবময় ইতিহাস-ঐতিহ্যকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আরও জীবন্ত, সহজবোধ্য ও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারব?

তাই একবিংশ শতাব্দীর প্রত্ন-পর্যটক শুধু কোনো ঐতিহাসিক স্থাপনা ‘দেখতে’ চান না; তিনি জানতে চান, বুঝতে চান এবং সেই সময়কে অনুভব করতে চান। একটি ভগ্ন প্রাচীরের সামনে দাঁড়িয়ে তার মনে প্রশ্ন জাগে—এই স্থাপনাটি যখন অক্ষত ছিল তখন দেখতে কেমন ছিল? কারা এখানে বসবাস করতেন? কী ছিল তাঁদের জীবনযাপন? কোথা দিয়ে মানুষ প্রবেশ করত? কোন কক্ষে কী কাজ হতো?

এই জায়গাতেই ডিজিটাল রূপান্তর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বাংলাদেশের প্রত্ন-পর্যটনের সামনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

প্রত্নতাত্ত্বিক  ধ্বংসাবশেষ থেকে ‘জীবন্ত ইতিহাস’

ধরা যাক, একজন পর্যটক পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহারের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর চোখের সামনে রয়েছে বর্তমানের প্রত্নস্থল। কিন্তু মোবাইল ফোন বা ভবিষ্যতের Augmented Reality—AR চশমার মাধ্যমে সেই একই জায়গায় তিনি দেখতে পাচ্ছেন শত শত বছর আগের সম্ভাব্য পুনর্গঠিত মহাবিহার।

কোথায় ছিল প্রবেশপথ, কোথায় ছিল ভিক্ষুদের কক্ষ, কেন্দ্রীয় মন্দিরের উচ্চতা ও বিন্যাস কেমন ছিল কিংবা পুরো কমপ্লেক্সটি তখন কেমন দেখতে হতে পারে—প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি ত্রি-মাত্রিক পুনর্গঠন তাঁর সামনে ফুটে উঠতে পারে।

তিনি হাঁটছেন বর্তমানের পাহাড়পুরে, অথচ প্রযুক্তির সাহায্যে একই সঙ্গে প্রবেশ করছেন অতীতের পাহাড়পুরে। এটি এখন আর কল্পবিজ্ঞানের বিষয় নয়।

3D scanning, photogrammetry, LiDAR, GIS, Digital Twin, Augmented Reality এবং Virtual Reality প্রযুক্তি বিশ্বের বিভিন্ন ঐতিহ্যস্থলের নথিবদ্ধকরণ, গবেষণা, সংরক্ষণ ও উপস্থাপনে ব্যবহার শুরু  হচ্ছে। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থলেও পরিকল্পিতভাবে এসব প্রযুক্তি প্রয়োগ করা সম্ভব।
এর প্রয়োজন শুধু পর্যটনের জন্য নয়।

কোনো প্রত্নস্থল বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, অতিবৃষ্টি, আর্দ্রতা, ভূমিক্ষয়, পরিবেশগত পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নির্মাণ কিংবা মানুষের কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার পূর্বাবস্থার একটি অত্যন্ত নির্ভুল ডিজিটাল রেকর্ড গবেষক ও সংরক্ষণবিদদের হাতে থাকা জরুরি। সেই অর্থে একটি Digital Twin একই সঙ্গে হতে পারে প্রত্ন-পর্যটনের জানালা এবং প্রত্নঐতিহ্যের এক ধরনের ডিজিটাল বীমা।

প্রতিটি পর্যটকের সঙ্গে একজন এআই ইতিহাসবিদ

বর্তমানে কোনো প্রত্নস্থলে গিয়ে ইতিহাস জানার প্রধান মাধ্যম হলো সাইনবোর্ড, বই, তথ্যকেন্দ্র কিংবা গাইড। ভবিষ্যতে এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে একটি এআই-ভিত্তিক ব্যক্তিগত Archaeological Heritage Guide।

মহাস্থানগড়ে দাঁড়িয়ে একজন পর্যটক বাংলায় প্রশ্ন করতে পারেন—
“এই নগরীর বয়স কত?”
“করতোয়া নদীর সঙ্গে মহাস্থানের সম্পর্ক কী ছিল?”
“এখানে আবিষ্কৃত প্রত্নবস্তু আমাদের কী তথ্য দেয়?”
“এই অংশটি কোন সময়ের?”

এআই যাচাইকৃত প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যভাণ্ডার থেকে তার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে।
একজন বিদেশি পর্যটক একই প্রশ্ন ইংরেজি, জাপানি, ফরাসি, আরবি, ফারসি,স্প্যানিশ কিংবা নিজের ভাষায় করতে পারবেন। ভাষার প্রতিবন্ধকতা তখন বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য জানার পথে বড় কোনো বাধা হয়ে থাকবে না।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একই ইতিহাস সবার জন্য একইভাবে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।
একজন শিশুকে গল্পের ভাষায় বলা যেতে পারে। মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীকে দেওয়া যেতে পারে সহজ সময়রেখা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দেখতে পারেন প্রত্নতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট। একজন গবেষক চাইলে সংশ্লিষ্ট খনন প্রতিবেদন, গবেষণাপত্র, মানচিত্র ও প্রত্নবস্তুর ডিজিটাল ক্যাটালগ পর্যন্ত দেখতে পারবেন।

তখন প্রত্নস্থল আর শুধু নীরব ইট-পাথরের সমষ্টি থাকবে না। মানুষ ও ঐতিহ্যের মধ্যে তৈরি হবে এক ধরনের interactive conversation।

প্রয়োজন জাতীয় ‘ডিজিটাল প্রত্নভাণ্ডার’

বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো তথ্যের বিচ্ছিন্নতা। কোথাও রয়েছে পুরোনো মানচিত্র, কোথাও খনন প্রতিবেদন, কোথাও স্থাপত্য নকশা, কোথাও আলোকচিত্র, আবার কোথাও প্রত্নবস্তুর তালিকা।

এর মূল কারণ হিসেবে বাংলা নিয়ে বিগত তিনশো বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা। প্রথমে ১৫৭৫ সালে ঐতিহাসিক গৌড় বাংলার প্রায় ৬০০ বছরের রাজধানীর স্থানান্তর। ২য় পর্যায়ে ১৬১০ সালে ঢাকায় বাংলার রাজধানী স্থানান্তর। ৩য় পর্যায়ে ১৭০৪ সালে মুর্শিদাবাদে বাংলা-বিহার-উরিষ্যা রাজধানী স্থানান্তর। ৪র্থ পর্যায়ে ১৭৫৮ সালে বাংলা রাজধানী কলকাতায় স্থানান্তর। ৫ম পর্যায়ে ১৯০৫ সালে পূর্ববঙ্গ ও আসাম তথা বাংলার রাজধানী পুনরায় স্থানান্তর। ৬ষ্ঠ পর্যায়ে ১৯১১সালে বাংলার রাজধানী বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দিল্লিতে  স্থানান্তর। ৭ম পর্যায়ে ১৯৪৭ সালে বাংলার রাজধানী দিল্লি থেকে বাংলা থেকে আবারো আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পাকিস্তানের লাহোরে স্থানান্তর। ৮ম পর্যায়ে ১৯৭১ সালে বাংলা তথা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর হয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়ে অদ্যবধি স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে।

অতএব উপরোক্ত রাজনৈতিক অস্থিরতা ও স্থানিক পরিবর্তন বিষয়ে বুঝতেই পারছেন বিগত প্রায় ৫০০ বছরে কতো ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে। তাই এগুলোকে পর্যায়ক্রমে একটি সমন্বিত National Digital Archaeology Platform বা জাতীয় ডিজিটাল প্রত্নভাণ্ডারে নিয়ে আসা গেলে গবেষণা, সংরক্ষণ, শিক্ষা ও পর্যটন—চারটি ক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থলের ডিজিটাল পাতায় থাকতে পারে— ৩৬০ ডিগ্রি ভার্চুয়াল ভ্রমণ, উচ্চ রেজল্যুশনের আলোকচিত্র, থ্রিডি মডেল, সময়রেখা, পুরোনো ও নতুন মানচিত্র, খননের ইতিহাস, গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা, প্রত্নবস্তুর ডিজিটাল ক্যাটালগ, সংরক্ষণ পরিস্থিতি এবং ভ্রমণসংক্রান্ত ব্যবহারিক তথ্য।

বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বসে একজন মানুষ তখন বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের দরজায় প্রবেশ করতে পারবেন।

কেউ হয়তো ইউরোপে বসে সোমপুর তথা পাহাড়পুর অথবা বাগেরহাটের ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদ ইত্যাদি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন  একটি virtual tour দেখলেন। সেই ডিজিটাল অভিজ্ঞতাই তাঁকে একদিন বাস্তবে বাংলাদেশে এসে স্থানটি দেখার আগ্রহী করে তুলতে পারে।

তাই ভার্চুয়াল Tourism বাস্তব প্রত্ন-পর্যটনের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে এটি বাস্তব প্রত্ন-পর্যটনের শক্তিশালী প্রচারণামাধ্যম হতে পারে।

এআই পর্যটককে পথ দেখানোর পাশাপাশি প্রত্নস্থলও রক্ষা করতে পারে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ব্যবহার হয়তো পর্যটকের চোখের সামনেও থাকবে না। এগুলো কাজ করবে নেপথ্যে। ড্রোন কিংবা স্যাটেলাইট থেকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর সংগৃহীত ছবি AI-এর সাহায্যে বিশ্লেষণ করে ভূমিক্ষয়, জলাবদ্ধতা, অবৈধ স্থাপনা, জমির ব্যবহারের পরিবর্তন কিংবা প্রত্নস্থলের আশপাশে নতুন ঝুঁকির প্রাথমিক ইঙ্গিত শনাক্ত করা যেতে পারে।

কম্পিউটার ভিশন ব্যবহার করে একই স্থাপনার বিভিন্ন সময়ের ছবি তুলনা করে দেয়ালে নতুন ফাটল, পৃষ্ঠের ক্ষয়, উদ্ভিদের অস্বাভাবিক বিস্তার বা আর্দ্রতাজনিত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে সহায়তা পাওয়া সম্ভব।

বছরের পর বছর সংগৃহীত পরিবেশগত ও স্থাপত্যগত তথ্য বিশ্লেষণ করে Machine Learning ভবিষ্যতে কোন স্থাপনাটি তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে, তা চিহ্নিত করতেও সহায়ক হতে পারে। এখানে প্রযুক্তির ভূমিকা ‘প্রত্ন-পর্যটন উন্নয়ন’-এর সীমা অতিক্রম করে চলে যায় ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়িত্বে।

কারণ প্রত্ন-পর্যটনের মূলধন কোনো হোটেল, রেস্তোরাঁ বা বিপণিবিতান নয়। এর সবচেয়ে বড় মূলধন হলো প্রত্নসম্পদ নিজেই (Archaeological Heritage)।

সেই সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত করে পর্যটন বাড়ানোর চেষ্টা নিজের ভিত্তিই দুর্বল করার শামিল।

অদেখা ইতিহাস খুঁজতেও প্রযুক্তি

বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্ভাবনা পরিচিত কয়েকটি স্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, পলি জমা, কৃষিকাজ, নগরায়ণ এবং মানুষের দীর্ঘ বসতির কারণে বহু প্রাচীন জনপদের চিহ্ন মাটির নিচে কিংবা বর্তমান ভূদৃশ্যের সঙ্গে মিশে থাকতে পারে। Satellite imagery, remote sensing, GIS ও এআই-ভিত্তিক pattern recognition ব্যবহার করে অস্বাভাবিক ভূমিরূপ, পুরোনো নদীপথ কিংবা সম্ভাব্য মানবসৃষ্ট কাঠামোর চিহ্ন শনাক্ত করে গবেষণার নতুন এলাকা চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে। তবে এখানে একটি মৌলিক নীতি মনে রাখা জরুরি।

এআই প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের সহায়ক হতে পারে, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণের বিকল্প নয়। এআই বলতে পারে—“এই জায়গাটি অনুসন্ধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।” কিন্তু সেটি কী, কোন সময়ের, কেন সেখানে রয়েছে—এসব প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক উত্তর দিতে হবে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান, খনন, বস্তু বিশ্লেষণ ও বিশেষজ্ঞ গবেষণার মাধ্যমে। অর্থাৎ এআই হবে প্রত্নতত্ত্ববিদের সহকারী—প্রত্নতত্ত্ববিদের বিকল্প নয়।

বিচ্ছিন্ন প্রত্নস্থল থেকে ‘Archaeological Tourism Circuit’

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে প্রায়ই আলাদা আলাদা গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু ডিজিটাল ম্যাপিং ও এআই ব্যবহারের মাধ্যমে এগুলোকে ঐতিহাসিক বিষয়ভিত্তিক Archaeological Tourism Circuit-এ রূপ দেওয়া সম্ভব।

কেউ যদি প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্য দেখতে  আগ্রহী হন, তাঁর জন্য তৈরি হতে পারে Buddhist Heritage Route। আবার কেউ মধ্যযুগীয় বাংলার ইসলামি স্থাপত্যে আগ্রহী পর্যটকের জন্য হতে পারে পৃথক Islamic Architectural Heritage Route।

একইভাবে প্রাচীন নগরসভ্যতা, নদীকেন্দ্রিক জনপদ, সুলতানি স্হাপত্য, মুঘল স্থাপত্য, ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য, বাংলার মন্দির স্থাপত্য কিংবা নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রত্ন-ঐতিহ্য ঘিরে আলাদা ভ্রমণপথ তৈরি করা যায়। পর্যটকের হাতে সময় তিন দিন না দশ দিন, বাজেট কত, কোথা থেকে যাত্রা শুরু করবেন, তাঁর আগ্রহ কী—এআই এসব বিবেচনায় নিয়ে ব্যক্তিগত itinerary প্রস্তাব করতে পারে।

তার সঙ্গে একই ডিজিটাল ব্যবস্থায় যদি পরিবহন, প্রবেশ টিকিট/ ই-টিকেট, স্থানীয় গাইড, আবাসন, জাদুঘর, খাবার ও স্থানীয় হস্তশিল্প যুক্ত করা যায়, তাহলে একটি প্রত্নস্থলকে কেন্দ্র করে পুরো স্থানীয় অর্থনীতির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

স্থানীয় জনগোষ্ঠিকে বাদ দিয়ে ‘স্মার্ট পর্যটন’ নয়

প্রযুক্তিনির্ভর পর্যটনের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়—প্রত্নস্থানের আশপাশে বসবাসকারী মানুষদের নিয়ে। তাদের কেবল পর্যটকের দর্শক হিসেবে রেখে কোনো টেকসই প্রত্ন-পর্যটন গড়ে ওঠে না।

স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ডিজিটাল হেরিটেজ গাইড তৈরি করা যেতে পারে। স্থানীয় ইতিহাস, লোককথা, খাদ্যসংস্কৃতি, কারুশিল্প ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি যথাযথ যাচাই ও নথিবদ্ধকরণের মাধ্যমে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত করা যায়।

পর্যটক স্থানীয় গাইড বুক করতে পারেন, স্থানীয় উদ্যোক্তার পণ্য কিনতে পারেন কিংবা স্থানীয় খাবার ও সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা নিতে পারেন। ফলে প্রযুক্তির আর্থিক সুফল শুধু বড় প্রতিষ্ঠান নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছাবে।

আগামী দিনের সফল প্রত্ন-পর্যটনের একটি সহজ সূত্র তাই হতে পারে— Heritage + Technology + Community = Sustainable Tourism

সবচেয়ে বড় বিপদ—AI যদি ইতিহাস বানাতে শুরু করে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা যত বড়, এর ঝুঁকিও তত বাস্তব। Generative এআই কখনো কখনো এমন তথ্যও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করতে পারে, যার যথেষ্ট ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। কোনো প্রত্নস্থলের একটি অংশ দেখতে আসলে কেমন ছিল তা যদি নিশ্চিতভাবে জানা না থাকে, অথচ AI কল্পনার ভিত্তিতে একটি চমৎকার ছবি তৈরি করে এবং পর্যটক সেটিকে প্রমাণিত ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করেন—তাহলে প্রযুক্তিই ইতিহাস বিকৃতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

তাই প্রত্ন-ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে সাধারণ ইন্টারনেটভিত্তিক এআই ব্যবহারের পরিবর্তে প্রয়োজন একটি বিশেষায়িত, যাচাইকৃত Heritage এআই  ও প্রত্নতত্ত্ববিদ কর্তৃক যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থা।

এর তথ্যের ভিত্তি হতে হবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নথি, অনুমোদিত খনন প্রতিবেদন, গবেষণাপত্র, জাদুঘরের ক্যাটালগ, প্রকাশিত প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা এবং বিশেষজ্ঞ-যাচাইকৃত তথ্য। যেখানে তথ্য নিশ্চিত নয়, সেখানে এআই-কে স্পষ্টভাবে বলতে হবে— “এ বিষয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।” অথবা “এটি বিদ্যমান তথ্যের ভিত্তিতে একটি সম্ভাব্য পুনর্গঠন, নিশ্চিত ঐতিহাসিক রূপ নয়।” প্রযুক্তি যত আধুনিকই হোক, ইতিহাসের সত্যতার সঙ্গে আপস করার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের সামনে এখনই সুযোগ

বাংলাদেশ বর্তমানে এমন একটি সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন কয়েকটি পৃথক উদ্যোগকে এক জায়গায় নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। দেশের প্রত্ন-পর্যটন উন্নয়নের জন্য জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের জন্য জাতীয় পর্যায়ে নীতিগত কাঠামো তৈরির উদ্যোগও চলছে। অন্যদিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে দেশের বিস্তৃত প্রত্ন-ঐতিহ্য, জাদুঘর, গবেষণা ও সংরক্ষণ কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে চলমান   রয়েছে।

এখন প্রয়োজন পর্যটন, সংস্কৃতি, প্রত্নতত্ত্ব, শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তিকে বিচ্ছিন্ন খাত হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত Archaeological Heritage  Technology কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা।

প্রথম পর্যায়ে মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর, ময়নামতি, বাগেরহাট এবং গৌড় গ্রুপ অফ মুসলিম মনুমেন্টসের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নাঞ্চল নিয়ে পরীক্ষামূলক Digital Heritage Zone গড়ে তোলা যেতে পারে।

সেখানে পর্যায়ক্রমে চালু করা যেতে পারে— 3D documentation ও scanning, Digital Twin, GIS-based heritage mapping, multilingual AI Heritage Guide, QR ও location-based information system, smart ticketing, visitor analytics, 360° virtual tour এবং AR/VR experience।

পরীক্ষামূলক প্রকল্পের সফলতা, ব্যয়, দর্শনার্থীর অভিজ্ঞতা এবং সংরক্ষণগত ফলাফল মূল্যায়ন করে পরে অন্য প্রত্নস্থলে এই মডেল সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। এখানে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যও বিশাল সুযোগ রয়েছে।

প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস, কম্পিউটার বিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, স্থাপত্য, ভূগোল, Remote Sensing, Tourism and Hospitality এবং Conservation Science-এর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যৌথ গবেষণায় যুক্ত করা গেলে বাংলাদেশের নিজস্ব Digital Heritage ecosystem তৈরি হতে পারে।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়তো কোনো প্রত্নস্থলের 3D model তৈরি করবেন, অন্য দল satellite data বিশ্লেষণ করবে, আরেক দল বাংলাভিত্তিক হেরিটেজ এআই তৈরি করবে, প্রত্নতত্ত্ববিদরা তথ্য যাচাই করবেন এবং স্থানীয় তরুণরা সেটিকে পর্যটকদের সামনে বাস্তবে ব্যবহার করবেন।

এভাবেই প্রত্নঐতিহ্য একই সঙ্গে হয়ে উঠতে পারে গবেষণা, উদ্ভাবন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও পর্যটনের ক্ষেত্র।

‘দেখার জায়গা’ থেকে ‘জানার গন্তব্য’

বিশ্ব পর্যটনের প্রতিযোগিতা এখন শুধু কে কত সুন্দর দৃশ্য দেখাতে পারে, সেই প্রতিযোগিতা নয়। প্রতিযোগিতা হচ্ছে— কে তার গল্প কত শক্তিশালীভাবে বলতে পারে।

বাংলাদেশের সৌভাগ্য হলো, সেই গল্প আমাদের নতুন করে বানাতে হবে না। হাজার বছরের গৌরবময় ইতিহাস-ঐতিহ্য কথা  আমাদের মাটিতেই লেখা রয়েছে।

প্রয়োজন সেই ইতিহাস-ঐতিহ্যকে খুঁজে বের করা, বৈজ্ঞানিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং নতুন প্রজন্ম ও বিশ্বের মানুষের সামনে এমনভাবে উপস্থাপন করা, যাতে একজন দর্শনার্থী শুধু একটি ভগ্ন প্রাচীর না দেখেন—তিনি যেন সেই প্রাচীরের পেছনে থাকা একটি সময়, সমাজ ও সভ্যতাকেও উপলব্ধি করতে পারেন।

আগামী দিনের কোনো পর্যটক হয়তো মহাস্থানগড়ের প্রায় তিন বছরের প্রাচীন  প্রাচীরের পাশে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোন তুলবেন। পর্দায় তার সামনে জেগে উঠবে বহু শতাব্দী আগের একটি নগরের সম্ভাব্য দৃশ্য। পাশে তার নিজের ভাষায় এআই বলে যাবে নগরটির ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা।

কিন্তু সেই ডিজিটাল দৃশ্যের নিচেই থাকবে আসল মাটি—যে মাটিতে একদিন সত্যিই মানুষ হেঁটেছিল।
প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সার্থকতা সেখানেই— অতীতকে বদলে দেওয়া নয়, অতীতকে আরও স্পষ্ট করে বর্তমানের সামনে তুলে ধরা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইতিহাস-ঐতিহ্যের লেখক হবে না। লেখক থাকবে ইতিহাস-ঐতিহ্য। এআই হবে সেই ইতিহাস-ঐতিহ্যের নতুন ভাষান্তরকারী।

ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিকল্পিত, দায়িত্বশীল ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রয়োগ ঘটাতে পারলে বাংলাদেশের প্রত্ন-পর্যটন শুধু অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলবে না; এটি আমাদের নিজেদের ইতিহাসকে নতুনভাবে জানার, আরও কার্যকরভাবে সংরক্ষণ করার এবং বিশ্বের সামনে হাজার বছরের বাংলাদেশের গল্প নতুন ভাষায় বলার এক অসাধারণ সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

প্রত্ন-ঐতিহ্য অতীতের সম্পদ হলেও তার দায়িত্ব বর্তমানের—আর তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা আজ তাকে কতটা জ্ঞান, যত্ন ও দূরদর্শিতার সঙ্গে সংরক্ষণ করতে পারছি তার ওপর।

বাংলাদেশের প্রত্নঐতিহ্য আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির মূল্যবান সম্পদ। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে এসব ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ, গবেষণা ও বিশ্বের মানুষের কাছে আরও সহজভাবে তুলে ধরা সম্ভব। তবে প্রযুক্তি যেন কখনো ইতিহাসের সত্যতাকে বিকৃত না করে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে ঐতিহ্য, প্রযুক্তি ও পর্যটনের সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাংলাদেশের প্রত্ন-পর্যটন আরও সমৃদ্ধ ও টেকসই হবে। অতীতকে সংরক্ষণ করেই প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

পরিশেষে বলা যায় যে, “ডিজিটাল রুপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশে এ-ই প্রথম ২০২৬ সালে -বাংলাদেশ সরকারের বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী বিশ্ব পর্যটন দিবস-২০২৬-এ বিভিন্ন সেমিনার, আলোচনা অনুষ্ঠান ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয় এবং সেই সাথে সাথে বিগত বছরে পর্যটনে অবদান রাখায় প্রায় ১৬টি প্রতিষ্ঠান / ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কৃত করা হয়েছে “বাংলাদেশ সার্থক হোক বিশ্ব পর্যটন। সফল হোক বাংলাদেশের আগামীর প্রত্ন-পর্যটন। 

লেখক: উপপরিচালক, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়