অনলাইন ডেস্ক: বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশেও তা একলাফে বাড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম যখন কমতে থাকে, তখন তার ইতিবাচক প্রভাব এদেশের বাজারে প্রায় দেখাই যায় না। দীর্ঘদিন ধরেই ভোক্তারা এই বৈষম্য নিয়ে অভিযোগ করে আসছেন, যা বিভিন্ন সময় পরিসংখ্যানেও সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে।
সাধারণত আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির পর প্রতিটি দেশই নিজস্ব প্রক্রিয়ায় এর খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে। বিশ্বে মূলত তিনটি পদ্ধতিতে তেলের দাম ঠিক হয়-বাজারদরের সাথে নিয়মিত স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ এবং নির্দিষ্ট একদর পদ্ধতি।
বাংলাদেশে আগে সরকারের হাতে একদর নির্ধারণের ক্ষমতা ছিল, যা পরে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের হাতে যায়। তবে পরবর্তীকালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্বাহী আদেশে একলাফে দাম বাড়িয়ে কমিশনকে বাইপাস করে সরকার নিজেই তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা নিজের হাতে নেয়। এরপর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পরামর্শে স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় চালু হলেও, বাস্তবে বিশ্ববাজারে দাম কমলে তার প্রতিফলন দেশের বাজারে দেখা যায় না।
বর্তমানেও নীতিমালার প্রথাসিদ্ধ অনুমোদন না হওয়ায় সার্বিক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়। ফলে বিইআরসি আইনিভাবে প্রস্তুত থাকলেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারছে না।
কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার পরও দেশে কেন তেলের দাম চড়া থাকে? এর প্রধান কারণ হলো তেল আমদানির পর পরিশোধনাগার, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং বিপণন সংক্রান্ত ব্যয়ের বোঝা। এর সাথে যুক্ত হয় উচ্চ হারের ভ্যাট, ট্যাক্স এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের নিজস্ব মুনাফার হিসাব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আমদানির পর বিভিন্ন স্তরের অতিরিক্ত ট্যাক্স-ভ্যাট প্রত্যাহার করা এবং সরবরাহ লাইনের চুরি ও অপচয় বন্ধ করা গেলে সাধারণ মানুষের জন্য তেলের দাম অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। অন্যদিকে বিপিসির মুনাফার অর্থ তেলের দুর্দিনে ব্যবহার না করে অন্যান্য খাতে সরিয়ে নেওয়া এবং পূর্বের লোকসান উসুলের প্রবণতাও দাম না কমানোর অন্যতম কারণ।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মতে, পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি অনুসরণ করলে কিংবা পাচার রোধ না করলে রাষ্ট্রীয় বিপুল লোকসান এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সাময়িক ভারসাম্য রক্ষায় তেলের উচ্চমূল্য বজায় রাখতে হয়। তবে সঠিক নীতি ও স্বচ্ছতার অভাবেই বিশ্ববাজারের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এদেশের সাধারণ জনগণ।
বিশ্ববাজারে যখন অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৮ ডলার কমে ১০১ ডলারে নেমে এলো, ঠিক তখনই বাংলাদেশে লিটার প্রতি তেলের দাম বাড়ানো হলো একলাফে ২০ টাকা! বিশ্ববাজারে দাম কমলে আমাদের দেশে কেন দাম কমে না? মূল কারণ আমদানির পর অতিরিক্ত ভ্যাট, ট্যাক্স, পরিবহন খরচ আর বিপিসির মুনাফা ধরে রাখা। বিশ্ববাজারের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাতে সরবরাহ ব্যবস্থার এই অতিরিক্ত খরচের বোঝা আর প্রশাসনিক জটিলতা অবিলম্বে দূর করা জরুরি।
তেলে ভর্তুকি দেওয়ার কথা বলা হলেও আবার কেন বসানো হয় চড়া ভ্যাট আর ট্যাক্স? বিপিসি হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করলেও বিপদের দিনে কেন তার সুবিধা পান না সাধারণ জনগণ? করোনা মহামারির আগে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছিল বিপিসি, কিন্তু সেই টাকা জমিয়ে না রেখে খরচ করা হয়েছে অন্য খাতে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও দেশে লোকসান কাটাতে জনগণের ওপরই চাপানো হচ্ছে উচ্চমূল্যের বোঝা।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি
