নীরব স্বাস্থ্য সংকট ‘স্লিপ শেমিং’, চিকিৎসকদের উদ্বেগ

অনলাইন ডেস্ক: দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার কারণে পরিবার কিংবা সমাজে কটূক্তি ও তাচ্ছিল্য করার ঘটনাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হচ্ছে ‘স্লিপ শেমিং’ (Sleep Shaming)। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে ভোরে ঘুম থেকে ওঠাকে অনুশাসন ও সফলতার প্রতীক এবং সকালে একটু দেরি করে ওঠাকে সরাসরি অলসতা হিসেবে বিবেচনা করার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিকিৎসকেরা বিষয়টিকে একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। চিকিৎসকদের মতে, কম ঘুমানোকে কঠোর পরিশ্রম বা নিষ্ঠার নিদর্শন মনে করা এবং পর্যাপ্ত ঘুমকে অলসতা আখ্যা দেওয়া আধুনিক জীবনের অন্যতম বড় একটি ভুল ও ক্ষতিকর ধারণা।

চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী ঘুম কোনো বিলাসিতা বা নিছক সময় নষ্টের বিষয় নয়, বরং এটি মানবদেহের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ‘রিসেট বোতাম’। একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখতে প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন ঘুম অত্যন্ত জরুরি। ঘুম মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে, মেজাজ স্থিতিশীল রাখে এবং মস্তিষ্কের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। সমাজের কটূক্তির ভয়ে বা জীবনযাত্রার চাপে নিয়মিত অপর্যাপ্ত ঘুমালে স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, মানসিক অবসাদ এবং স্মৃতিভ্রংশ বা ডিমেনশিয়ার মতো মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বহু গুণ বেড়ে যায়।

ভোরে ওঠার সঙ্গে সাফল্যের সরাসরি কোনো যোগসূত্র নেই বলে স্পষ্ট করেছে বিজ্ঞান। মূলত মানুষের শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি বা ‘ক্রোনোটাইপ’ (Chronotype)-এর কারণে ঘুমের ছন্দ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়ে থাকে। জেনেটিক্স, বয়স ও হরমোনের তারতম্যের কারণে কেউ প্রাকৃতিকভাবে ভোরে সক্রিয় বা ‘মর্নিং লার্ক’ হন, আবার কেউ রাতের বেলায় বেশি কর্মক্ষম বা ‘নাইট আউল’ হয়ে থাকেন। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালীন শারীরিক ও হরমোনগত পরিবর্তনের কারণে কিশোর ও তরুণদের রাতে দেরিতে ঘুম আসা একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। ফলে একজন ব্যক্তি ঘড়ির কাঁটায় কখন ঘুমাচ্ছেন বা উঠছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি প্রতিদিন নিজের শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত ও গভীর ঘুম পাচ্ছেন কি না।

গভীর ঘুমের মাঝপথে কাউকে জোর করে বা হঠাৎ ডেকে তোলা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। চিকিৎসকরা ব্যাখ্যা করেছেন, মানুষের ঘুম মূলত ৯০ মিনিটের কয়েকটি নির্দিষ্ট চক্রে সম্পন্ন হয়, যার প্রতিটি ধাপ মানসিক ক্লান্তি দূর করতে এবং স্মৃতিশক্তি মজবুত রাখতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এই চক্রের মাঝখানে ঘুম ভেঙে দিলে শরীরে তীব্র ঝিমুনি ও মাথা ঘোরার মতো অনুভূতি তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদে এমন ব্যাঘাতের ফলে মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, ধৈর্য ও সৃজনশীলতা হ্রাস পায় এবং ব্যক্তি খিটখিটে মেজাজ ও দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন।
জেএ/অভি