বড় মূলধনি শেয়ারে বিক্রির চাপে দরপতন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: সাম্প্রতিক উত্থানের পর শেয়ারবাজারে আবারও মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। টানা কয়েকটি কার্যদিবসের দরবৃদ্ধির পর বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা নিতে শুরু করায় গতকাল বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বিক্রির চাপ বেড়েছে।

বাজারে নতুন করে বড় কোনো নেতিবাচক ঘটনা না থাকলেও বর্তমান উত্থান কতটা টেকসই হবে-এ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি রয়েছে। ফলে বড় মূলধনি শেয়ার থেকে অর্থ সরিয়ে স্বল্পমেয়াদি মুনাফার সুযোগ খুঁজেছেন অনেক বিনিয়োগকারী।

বাজারের এ প্রবণতায় সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে ব্যাংক, টেলিযোগাযোগ, প্রকৌশল ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে। বিপরীতে সাধারণ বিমা ও মিউচুয়াল ফান্ডে অর্থ প্রবাহ বেড়েছে। অর্থাৎ পুরো বাজার থেকে অর্থ বের না হয়ে এক খাত থেকে অন্য খাতে স্থানান্তরের প্রবণতা দেখা গেছে।

বৃহস্পতিবার ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৭ দশমিক ৮৯ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৫৭৮ দশমিক ৩৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আগের কার্যদিবসে সূচক ছিল ৫ হাজার ৫৯৬ দশমিক ২২ পয়েন্ট। একইসঙ্গে ডিএস৩০ সূচক কমেছে ১০ দশমিক ৬০ পয়েন্ট।
লেনদেনেও কিছুটা গতি কমেছে। এদিন ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ৭৫৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা, যা আগের দিনের তুলনায় ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ কম। শেয়ার লেনদেন হয়েছে ২৩ কোটি ৮২ লাখের বেশি।

বাজারের ব্যাপ্তিও ছিল নেতিবাচক। দিন শেষে প্রায় ১৮৬ থেকে ১৯০টি কোম্পানির দর কমেছে। বিপরীতে বেড়েছে ১৩৯ থেকে ১৪১টি কোম্পানির শেয়ারদর। অ্যাডভান্স-ডিক্লাইনের অনুপাত ছিল দশমিক ৭৪, যা বাজারে বিক্রির চাপের চিত্র তুলে ধরে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ভালো করা শেয়ারগুলোতে স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা গ্রহণ স্বাভাবিক বিষয়। তবে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতার উপস্থিতি এখনও স্পষ্ট নয়। ফলে সামান্য বিক্রির চাপেই বড় মূলধনি শেয়ারগুলোতে সংশোধন দেখা যাচ্ছে।

এর সঙ্গে সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু বিষয়ও বিনিয়োগকারীদের সতর্ক রাখছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ১ দশমিক ৮৫ শতাংশে নেমেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এ সময়ে বরাদ্দ ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৭০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

খাতভিত্তিক লেনদেনে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। সাধারণ বিমা খাতে ইতিবাচক গতি ছিল। এ খাতে লেনদেন হয়েছে প্রায় ১৩৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং মোট বাজার লেনদেনে অংশ ছিল ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে ব্যাংক খাত দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। পূবালী ব্যাংক, ইউসিবি, ব্র্যাক ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংকের দরপতন সূচকে চাপ তৈরি করেছে।

মিউচুয়াল ফান্ডেও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখা গেছে। এ খাতের দর বেড়েছে ২ শতাংশ। পাশাপাশি টেক্সটাইল খাতে লেনদেন সক্রিয় ছিল। তবে কিছু শেয়ারে মুনাফা গ্রহণের চাপ দেখা গেছে। বিশেষ করে সায়হাম টেক্সটাইলের দর ৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমেছে, যদিও কোম্পানিটি দিনের অন্যতম বেশি লেনদেন হওয়া শেয়ারের একটি ছিল।

একক শেয়ারের মধ্যে জিকিউ বলপেন, আইপিডিসি, ফাইন ফুডস ও স্কয়ার ফার্মায় বড় লেনদেন হয়েছে। জিকিউ বলপেনের লেনদেন মূল্য ছিল প্রায় ৩৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা। আইপিডিসির লেনদেন হয়েছে প্রায় ২৪ কোটি ৩১ লাখ টাকার।

এদিকে ব্লক মার্কেটেও বড় অঙ্কের লেনদেন হয়েছে। মোট ৫৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার ব্লক লেনদেনের মধ্যে ফাইন ফুডসের শেয়ারে ১৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা এবং জিকিউ বলপেনে ১২ কোটি ৪১ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে।

বাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তাই এখনও বেশি। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মোট লেনদেনের বড় অংশ খুচরা বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে হয়েছে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম ছিল। ফলে বাজারে স্বল্পমেয়াদি ট্রেডিং প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবারের বাজারের মূল চিত্র ছিল-উত্থানের পর মুনাফা গ্রহণ। বিনিয়োগকারীরা এখন পরবর্তী করপোরেট ফলাফল, ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি এবং বাজারে বড় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের দিকে নজর রাখছেন। বাজারে স্থায়ী গতি ফিরতে হলে স্বল্পমেয়াদি ট্রেডিংয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়াতে হবে।