চিকিৎসক-জনবল সংকটে ঝিনাইদহে ব্যাহত চিকিৎসাসেবা
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: চিকিৎসক ও জনবল সংকটে ঝিনাইদহের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। জেলার ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতালসহ ছয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ হাসপাতালেই অনুমোদিত পদের তুলনায় চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী কম। কোথাও অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ না থাকায় বন্ধ রয়েছে অপারেশন, আবার কোথাও টেকনিশিয়ান ও সনোলজিস্টের অভাবে এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম সেবা বন্ধ। এর মধ্যে সদর হাসপাতালে ২৫০ শয্যার বিপরীতে ভর্তি রয়েছেন ৪৯৫ রোগী।

ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৮৮টি। এর বিপরীতে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন ৩৮ জন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ২৫৫টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৬৬ জন। এছাড়া আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কাজ করছেন ২১ জন। অতিরিক্ত রোগীর চাপ ও চিকিৎসক সংকটের মধ্যেই সীমিত জনবল দিয়ে সেবা দিতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।

সদর হাসপাতালে জেনারেল সার্জারি, গাইনি, অর্থোপেডিক, ইএনটি ও ডেন্টাল বিভাগের অপারেশন হয়। অ্যানেস্থেশিয়া কনসালট্যান্টের দুটি পদেই চিকিৎসক কর্মরত আছেন। প্যাথলজি বিভাগ চালু রয়েছে এবং সাধারণ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনও সচল রয়েছে।

সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অনুমোদিত পদের তুলনায় চিকিৎসক ও জনবল কম রয়েছে। এরপরও অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল পাওয়া গেলে রোগীদের সেবার মান আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।

জেলার হরিণাকুন্ডু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সংকট আরও প্রকট। ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৩৭টি। কর্মরত আছেন ১৮ জন। এর মধ্যে তিনজন দীর্ঘদিন নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকায় কার্যত ১৫ জন চিকিৎসক দিয়ে চলছে সেবা। অনুমোদিত ১৬৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিপরীতে কর্মরত আছেন ৯৯ জন।

অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালটির অপারেশন থিয়েটার বন্ধ। এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন থাকলেও সেবা নিয়মিত নয়। প্যাথলজিস্টের তিনটি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন একজন। হাসপাতালের একমাত্র সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটিও অধিকাংশ সময় বিকল থাকে। কখনো সচল থাকলেও চালক না থাকায় অফিস সহকারী দিয়ে চালানোর অভিযোগ রয়েছে। ফলে গুরুতর রোগীদের জেলা সদরে স্থানান্তরেও সমস্যায় পড়তে হয়।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রহিম উদ্দিন বলেন, সকাল থেকে হাসপাতালে বসে থাকলেও ডাক্তার দেখাতে পারেননি। বারবার শহরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া তাদের মতো দরিদ্র মানুষের জন্য কঠিন। হরিশপুর গ্রামের সালমা খাতুন বলেন, সন্তানকে নিয়ে দূর থেকে হাসপাতালে এসেও ঠিকমতো চিকিৎসা পাননি। শেষ পর্যন্ত বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হয়েছে, যেখানে খরচ অনেক বেশি।

কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫০ শয্যার হলেও বর্তমানে ভর্তি রোগী ১২০ জন। চিকিৎসকের ৪৫টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন ২২ জন। অ্যানেস্থেশিয়া কনসালট্যান্ট না থাকায় হাসপাতালে কোনো অপারেশন হচ্ছে না। প্যাথলজি বিভাগ চালু থাকলেও টেকনিশিয়ান সংকটে এক্স-রে সেবা বন্ধ। সনোলজিস্ট চিকিৎসক না থাকায় আল্ট্রাসনোগ্রাম সেবাও বন্ধ রয়েছে।

হাসপাতালটিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুমোদিত পদ ২২২টি। নিয়মিত কর্মরত আছেন ১২৮ জন। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কাজ করছেন ১৩ জন।

কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আমানুল্লাহ আল মামুন বলেন, চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান সংকটের কারণে কিছু সেবা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ না থাকায় অপারেশন করা সম্ভব হচ্ছে না। জনবল পাওয়া গেলে সেবাগুলো আরও ভালোভাবে দেওয়া সম্ভব হবে।

শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫০ শয্যার বিপরীতে বর্তমানে ভর্তি রোগী ১২৬ জন। চিকিৎসকের ৪৯টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৩ জন। এর মধ্যে চারজন প্রেষণে রয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে শুধু সিজারিয়ান অপারেশন হচ্ছে। অ্যানেস্থেশিয়া কনসালট্যান্টের পদটি শূন্য। এক্স-রে সেবা চালু থাকলেও সনোলজিস্ট না থাকায় আল্ট্রাসনোগ্রাম সেবা বন্ধ।

হাসপাতালে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর ১৪১টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে নিয়মিত কর্মরত আছেন ৮২ জন। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কাজ করছেন ১৫ জন।

শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. রাশেদ আল মামুন বলেন, চিকিৎসক ও জনবল সংকট রয়েছে। সীমিত জনবল দিয়েই রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও জনবল পাওয়া গেলে সেবার পরিধি আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।

মহেশপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও একই চিত্র। ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে বর্তমানে ভর্তি রোগী ৮৫ জন। চিকিৎসকের ৪০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে নিয়মিত কর্মরত আছেন মাত্র ১৩ জন। অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ ও কনসালট্যান্ট সার্জন না থাকায় হাসপাতালটির অপারেশন বন্ধ রয়েছে।

প্যাথলজি বিভাগ চালু থাকলেও এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম সেবা ব্যাহত হচ্ছে। টেকনিশিয়ান পিআরএলে যাওয়ায় এক্স-রে সেবা বন্ধ রয়েছে। সনোলজিস্ট চিকিৎসক না থাকায় আল্ট্রাসনোগ্রামও করা যাচ্ছে না। হাসপাতালের ২১১টি অনুমোদিত কর্মকর্তা-কর্মচারী পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১০৪ জন। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কাজ করছেন আরও ১০ জন।

মহেশপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হেলেনা আক্তার বলেন, চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ সংকটের কারণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেবা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ ও সার্জন না থাকায় অপারেশন বন্ধ রয়েছে। জনবল সংকটের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

জেলার ছয় উপজেলার মধ্যে কোটচাঁদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য সংগ্রহের জন্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় হাসপাতালটির চিকিৎসক ও জনবলসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।

ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. মো. কামরুজ্জামান বলেন, জেলার হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও জনবল সংকট অনেক আগে থেকেই রয়েছে। এটি শুধু ঝিনাইদহের সমস্যা নয়, সারা দেশেই এমন সংকট রয়েছে। তবে সেবার মান উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক ও জনবল সংকট নিরসনের চেষ্টা চলছে।

তিনি বলেন, চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে সীমিত সক্ষমতার মধ্যেই রোগীদের সেবা দিতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, টেকনিশিয়ান ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ করা গেলে উপজেলা পর্যায়েই আরও বেশি রোগীকে উন্নত চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি