অবাধ বৈশ্বিক বাণিজ্যের যুগ কি শেষ?
ছবি: এআই জেনারেটড

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: কয়েক দশক ধরে বিশ্ব অর্থনীতি চলেছে একটি স্বস্তিদায়ক ধারণার ওপর—বাধাহীন বাণিজ্য ও পূর্বানুমানযোগ্য প্রবৃদ্ধি। কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী অবাধ বাণিজ্যের যুগ বদলে গিয়ে এখন বিশ্ব দাঁড়িয়েছে এক চরম বিভাজনের মুখে।

ভূগোল আর বাণিজ্য পথগুলোকে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মারাত্মক হাতিয়ার হিসেবে। লোহিত সাগর কিংবা হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অচলাবস্থা তৈরি করে বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থাকে বারবার বিপদে ফেলা হচ্ছে।

‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের আগ্রহ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে দিল্লি’

২০২৬-এর আগস্টে হরমুজ প্রণালিতে এলএনজি রপ্তানি ৯৫% কমে গেছে, যা গত এক দশকে প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক গ্যাস বাণিজ্যে চুক্তি হ্রাসের কারণ হয়েছে।

ফলে কোম্পানিগুলো আর সাশ্রয়ী 'জাস্ট-ইন-টাইম' বা ঠিক সময়ে পণ্য আনার কৌশলে ভরসা রাখতে পারছে না। বাধ্য হয়ে বিকল্প পথ ও বাড়তি মজুদের 'জাস্ট-ইন-কেস' মডেল বেছে নিচ্ছে তারা, যা পণ্যের পরিবহন খরচ ও ঝুঁকি প্রিমিয়াম এক লাফে বাড়িয়ে দিচ্ছে বহুগুণ।

দ্বিতীয় ধাক্কাটি আসছে খোদ নীতিনির্ধারণের জায়গা থেকে। একসময় বৈশ্বিক অর্থনীতিকে সচল রাখতে যে শুল্ক বা আন্তর্জাতিক নিয়ম ব্যবহার হতো, সেগুলোই এখন হয়ে উঠছে একে অপরকে ঘায়েলের অস্ত্র। জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে একতরফা নিষেধাজ্ঞা, বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানি বাধার কারণে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে গঠনমূলক ও ইতিবাচক সম্পর্ক চায় ভারত

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তির এক নজিরবিহীন ব্যয়বহুল প্রতিযোগিতা। ২০২৬ সালে শুধু চার বড় হাইপারস্কেলার—অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, গুগল ও মেটা—এআই অবকাঠামো ও ডেটা সেন্টারে প্রায় ৭২৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করবে, যা ২০২৫-এর তুলনায় ৭৭% বেশি। অরাকল ও এনভিডিয়া যুক্ত হলে এই সংখ্যা ৭৮৫ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়ে যাবে।

কিন্তু উৎপাদনশীলতায় এই বিপুল বিনিয়োগের আসল সুফল কখন মিলবে, তা এখনো পুরোপুরি অনিশ্চিত। এই বিপুল অর্থায়নের চাপ বিশ্বব্যাপী সুদের হার ও ঋণের ব্যয়কে ঊর্ধ্বমুখী করে তুলছে।

বিশ্ব অর্থনীতি এতগুলো ধাক্কা খেয়েও পুরোপুরি ধসে না পড়ার কারণ ছিল মার্কিন অর্থনীতির গতিশীলতা, বড় নগদ রিজার্ভ এবং মজুদের কিছুটা নিরাপত্তা। কিন্তু এই সাময়িক ঢালগুলোও এখন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

মার্কিন কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ ২০২৬-এর ১৪ আগস্ট নেমে এসেছে ২৯৩.৪ মিলিয়ন ব্যারেলে, যা ১৯৮২ সালের ডিসেম্বরের পর সর্বনিম্ন। এটি রিজার্ভের মোট ধারণক্ষমতার মাত্র ৪১%।

২০৩০ সালে বিশ্বের ৩২তম অর্থনীতি হবে বাংলাদেশ

অভ্যন্তরীণ তারল্য কমে আসায় ঋণগ্রস্ত বড় বড় ফান্ডগুলোও চাপের মুখে পড়ছে। লাগামহীন সরকারি ঘাটতি ব্যয় আর ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝায় বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থা যেকোনো সময় বড় ধরনের অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে।

অতীতের সেই নিশ্চিন্ত ও পূর্বানুমানযোগ্য বিশ্বে ফিরে যাওয়ার আশা আর নেই। কোনো একক পরিকল্পনায় আটকে না থেকে দ্রুত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কৌশল আর স্থিতিস্থাপকতা অর্জন করাই এখন টিকে থাকার একমাত্র পথ।

অনিশ্চয়তার এই 'নতুন স্বাভাবিক' বাস্তবতায় যারা দ্রুত বিকল্প পথ তৈরি করবে, বিজয় তাদেরই হবে।