পাটের ফলন ভালো, তবু দুশ্চিন্তায় যশোরের কৃষক
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

যশোর প্রতিনিধি: যশোরে এবার পাটের ক্ষেতজুড়ে সম্ভাবনার পাশাপাশি শঙ্কার ছবিও দেখা দিয়েছে। কোথাও কৃষক পাট কাটছেন, কোথাও চলছে জাগ দেওয়া, আবার কোথাও আঁশ ছাড়িয়ে শুকানোর কাজ। অনুকূল সময়ে মাঠে পাটের ফলন ভালো হলেও অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, বাড়তি শ্রম ও পরিবহন ব্যয় এবং বাজারদর নিয়ে অনিশ্চয়তায় স্বস্তি নেই কৃষকের।

চলতি মৌসুমে যশোরে ২৪ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে পাট আবাদ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে সাড়ে তিন টন ফলনের লক্ষ্যমাত্রা ধরে মোট উৎপাদন প্রায় ৮৫ হাজার ৪০০ টন হওয়ার কথা। তবে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে কয়েকটি এলাকায় ফলন কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কেশবপুরের নিম্নাঞ্চলে পানিতে তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাটের ক্ষেত।

কেশবপুর উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৬ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে পাট আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬৬ হেক্টর। প্রতি হেক্টরে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ৩ দশমিক ১৫ টন ফলন ধরলে ওই জমি থেকে প্রায় ২০৮ টন পাট পাওয়ার কথা ছিল। জলাবদ্ধতার কারণে সেই উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে কৃষকের সমস্যা শুধু ক্ষেতের ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ নয়। বীজ, সার, জমি তৈরি, আগাছা দমন, সেচ, শ্রমিকের মজুরি, পাট কাটা এবং জাগ দেওয়ার খরচ-সব মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। কৃষকদের ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে প্রতি বিঘায় ব্যয় ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে।

পাট জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানি না থাকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে পরিবহন ব্যয়। দূরের জলাশয়ে পাট নিয়ে যেতে হচ্ছে অনেক কৃষককে। জলাবদ্ধ জমিতে পাট কাটতেও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সময় লাগছে। ফলে শ্রমিকের মজুরিও গুনতে হচ্ছে বেশি।

কেশবপুরের নিম্নাঞ্চলের কৃষকদের আরেকটি বড় সমস্যা হয়েছে অপরিপক্ব পাট কাটা। সাধারণত বপনের প্রায় ১২০ দিন পর পাট কাটার উপযোগী হয়। ভাদ্রের শেষ দিকে কাটলে অনেক ক্ষেতেই পাট পূর্ণ পরিপক্ব হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ক্ষেত ডুবে যাওয়ায় বহু কৃষক আগেভাগেই পাট কাটতে বাধ্য হয়েছেন। এতে আঁশের মানের পাশাপাশি ফলনও কমেছে বলে জানিয়েছেন তারা।

কৃষকের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে বাজারদর। স্থানীয় কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকায়। উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে এ দরের সামঞ্জস্য না থাকায় ভালো ফলন পেলেও কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সদরের বিজয়নগর গ্রামের কৃষক বিষু কর্মকর বলেন, সার, বীজ, জমি তৈরি, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে বিঘাপ্রতি প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে কোথাও ফলন কমেছে, আবার কাটার সময় শ্রমিক ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। তার মতে, প্রতি মণ ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা দরে পাট বিক্রি করে সব খরচ বাদ দিলে প্রত্যাশিত লাভ থাকে না।

সদরের ডাকাতিয়া গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, মাঠে এবার পাট ভালো দেখা গেলেও উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। জাগ দেওয়ার মতো পানি না থাকায় দূরের জায়গায় পাট নিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ও শ্রমিকের পেছনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে। বাজারদর উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে ভালো ফলনও কৃষকের জন্য লাভজনক হবে না।

কেশবপুরের পাজিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুস সালাম জানান, অতিবৃষ্টিতে অনেক ক্ষেত পানির নিচে চলে যাওয়ায় আগেভাগেই পাট কাটতে হয়েছে। পানির মধ্যে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকরা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কম পাট কাটতে পারছেন। ফলে মজুরি ব্যয় বাড়ছে। অপরিপক্ব অবস্থায় কাটার কারণে আঁশের মানও ভালো হচ্ছে না। এ অবস্থায় ন্যায্য দাম না পেলে লোকসানের মুখে পড়তে হবে।

এদিকে গত বছরের তুলনায় কেশবপুরে পাটের আবাদও বেড়েছে। গত বছর উপজেলায় ৬ হাজার ৭০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছিল। চলতি বছর পাটের দাম ভালো থাকার প্রত্যাশায় ৬ হাজার ৫৮৫ হেক্টর জমিতে আবাদ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত আবাদ হয়েছে ৬ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে- লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫ হেক্টর এবং গত বছরের তুলনায় ৫৩০ হেক্টর বেশি।

চলতি মৌসুমে কেশবপুরে পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০ হাজার ৮০৫ মেট্রিক টন। এর সম্ভাব্য বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ১৬০ কোটি ২০ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। এই হিসাবে প্রতি টন পাটের গড় মূল্য প্রায় ৭৬ হাজার ৯৫৬ টাকা, অর্থাৎ প্রতি মণ প্রায় ৩ হাজার ৭৮ টাকা।

কেশবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, জলাবদ্ধতায় ৬৬ হেক্টর জমির পাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানির কারণে অনেক কৃষক নির্ধারিত সময়ের আগেই পাট কাটছেন। পাটের দাম ভালো থাকলেও আগাম কাটার কারণে অনেক কৃষক কাঙ্ক্ষিত ফলন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোশাররফ হোসেনের দাবি, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার যশোরে পাটের ফলন ভালো হয়েছে এবং কৃষকেরা ভালো দামও পাচ্ছেন। তার মতে, সরকারি পাট ক্রয়কেন্দ্রগুলো আরও কার্যকর করার পাশাপাশি পাটকলগুলোর মাধ্যমে সরাসরি পাট কেনার ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে কৃষকেরা কাঙ্ক্ষিত দাম পেতে পারেন।

ফলে মাঠে বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা থাকলেও যশোরের পাটচাষিদের হিসাব এখন একটাই- ফলন যতই ভালো হোক, উৎপাদন খরচ ও বাজারদরের ব্যবধান না কমলে ‘সোনালি আঁশ’ শেষ পর্যন্ত তাদের ঘরে কতটা স্বস্তি আনবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি