তারেক রহমানের সাম্প্রতিক কূটনীতি: কোন পথে হাঁটছে ঢাকা?
জাতীয় অর্থনীতি গ্রাফিকস

ইখতিয়ার মাহমুদ: গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে দেশে ও বিদেশে মূলত ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রিজমের মধ্য দিয়েই দেখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে একটি অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর এই দৃশ্যপটে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। বিগত সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশাসন দ্রুত একটি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি প্রতিষ্ঠা করছে।

সার্বভৌম সমতা, অর্থনৈতিক বাস্তববাদ এবং জাতীয় মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ঢাকা বিশ্বকে এই বার্তা দিচ্ছে যে, বাংলাদেশ আর কোনো নিষ্ক্রিয় ভূরাজনৈতিক গুটি নয়। এই নতুন ধারার মাধ্যমে মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট বা বহুমুখী জোটের একটি সুচিন্তিত প্রয়াস লক্ষ করা যাচ্ছে। যার মূল লক্ষ্য হলো কোনো একটি পরাশক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য নির্বাচন প্রমাণ করে যে, তিনি অর্থনৈতিক কূটনীতিকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন। ঐতিহ্যবাহী মিত্র নয়াদিল্লি বা ওয়াশিংটনে না গিয়ে তিনি প্রথমেই বেছে নিয়েছেন মালয়েশিয়া ও চীনকে। এর অর্থ এই নয় যে, কূটনীতিকে শুধুই বাণিজ্যিক লেনদেনে পরিণত করা হচ্ছে; বরং এর অর্থ হলো জাতীয় শক্তি যে অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত তা স্বীকার করে নেওয়া।

সামরিক পরাশক্তি হিসেবে নয় বরং শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ এবং একটি সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) কারণে মালয়েশিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, আসিয়ানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং আরসিইপিতে যুক্ত হওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা ঢাকার রয়েছে তাতে মালয়েশিয়ার সমর্থন একটি কৌশলগত অর্জন।

অন্যদিকে তারেক রহমানের চীন সফরে ২০টিরও বেশি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় এবং প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়। তবে চীনের সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠতাকে ‘ভারতবিরোধী’ জোটে যোগদান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঢাকার জন্য চীনের পুঁজি ও প্রযুক্তি যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি চীনা অর্থায়নের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যেন নতুন কোনো ফাঁদ তৈরি না করে সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন মানে এক দেশের নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল হওয়া নয়।

দিল্লির দ্বিধা এবং ঢাকার রেড লাইন
এই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের চূড়ান্ত পরীক্ষাটি বর্তমানে ভারতের সঙ্গেই হচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দ্বিপাক্ষিক সফর এবং সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস আউটরিচ সামিটে যোগ দেওয়ার জন্য তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আগে এ ধরনের আমন্ত্রণ পাওয়া মাত্রই সফর নিশ্চিত হয়ে যেত, তবে এবার দৃশ্যপট ভিন্ন।

ঢাকা একটি স্পষ্ট ‘রেড লাইন’ টেনে দিয়ে বলেছে যে, যেকোনো সফরের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি করা অপরিহার্য। এই পরিবেশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা (যিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত) এবং জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতা হত্যাযজ্ঞে জড়িত পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণের বিষয়টি। দেশের অভ্যন্তরে ১ হাজার ৪০০ শহিদের হত্যার বিচারের দাবিতে যে ঐকমত্য রয়েছে তা পাশ কাটিয়ে দিল্লির সঙ্গে আপস করলে সরকারকে মারাত্মক জনরোষের মুখে পড়তে হবে।

ঢাকা কার্যত নয়াদিল্লিকে বলছে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও বিচারিক উদ্বেগ থেকে আলাদা করে দেখা যাবে না। নতুন সম্পর্ক পূর্বনির্ধারিত নয়; বরং তা সমতার ভিত্তিতে দর কষাকষি ও সমঝোতার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। তবে ভূগোলের বাস্তবতায় ভারত বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। তাই জাতীয়তাবাদী আবেগে বশবর্তী হয়ে স্থায়ী বিরোধ তৈরি না করে একটি টেকসই আলোচনার কাঠামো তৈরি করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

আঞ্চলিক সমীকরণের পুনর্মূল্যায়ন
একক কোনো কৌশলগত কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশ নীরবে নতুন আঞ্চলিক সমীকরণও তৈরি করছে। ভারতের মিডিয়া কর্তৃক দাবীকৃত সংবাদ ‘সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার (ডিজিএফআই) কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক পাকিস্তান সফর’ ইঙ্গিত দেয় যে, ভারতের প্রভাব বলয়ের বাইরে গিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের সম্পর্ককে ঢেলে সাজাতে আগ্রহী ঢাকা।

এই আঞ্চলিক সমীকরণের পালে নতুন হাওয়া লাগিয়েছে একটি সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা জোটের খবর। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বর্তমান টানাপড়েনের মধ্যেই ঢাকা কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্কের নেতৃত্বাধীন নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামোতে যুক্ত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমে ইন্ডিয়া টুডের সংবাদ মতে, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির স্পষ্ট করেছেন যে, বিশ্ব অর্থনীতি এবং বাণিজ্যের পরিবর্তিত গতিশীলতার সঙ্গে নিজেদের স্বার্থের কথা মাথায় রেখে এই তিন দেশের সঙ্গে কোনো অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। উল্লেখ্য, গত ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি (Makkah Joint Defence Agreement) অনুযায়ী, চুক্তিবদ্ধ কোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা জোটের সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। এই জোটে মিসরও যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে যা এশিয়ায় একটি নতুন বলয় তৈরির ইঙ্গিত দেয়।

একইসঙ্গে, বহুপাক্ষিক কূটনীতির অংশ হিসেবে আসন্ন ব্রিকস (BRICS) আউটরিচ পর্ব এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে আসন্ন ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন ঢাকার জন্য বড় সুযোগ। এই ফোরামগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রমাণ করতে চায় যে, ভারত বা চীন—কাউকেই বেছে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ঢাকার নেই।

আসল পরীক্ষা: বাংলাদেশ কি ‘না’ বলতে পারে?
তারেক রহমানের পররাষ্ট্রনীতির চূড়ান্ত পরীক্ষা বিদেশ সফর বা চুক্তির সংখ্যা দিয়ে হবে না। চূড়ান্ত পরীক্ষা হবে প্রয়োজনে বাংলাদেশ কি ‘না’ বলতে পারে এবং তারপরও কি সম্পর্ক কার্যকর রাখতে পারে? এই প্রশ্নের ওপর।
ছোট বা মাঝারি আকারের একটি রাষ্ট্র কেবল বড় শক্তির সঙ্গে সংঘাতে গিয়ে কূটনৈতিক স্বায়ত্তশাসন অর্জন করে না; বরং নিজের নির্ভরতা কমিয়ে কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়ায়। এর জন্য প্রয়োজন একাধিক বাজার, বৈচিত্র্যময় জ্বালানি সরবরাহ, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং দক্ষ কূটনীতি।

তারেক রহমানের পররাষ্ট্রনীতিকে তাই হঠাৎ কোনো ভূরাজনৈতিক ‘পিভট’ হিসেবে না দেখে, একটি ‘পুনঃসমন্বয়’ (Recalibration) হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত। প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়া, বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততা বাড়ানো এবং ভারতের সঙ্গে কঠোর দর কষাকষির অবস্থান। এগুলো একই দিকে ইঙ্গিত করছে।

একটি প্রকৃত সবার আগে বাংলাদেশ নীতির শক্তিশালী অর্থ কেবল ভারতকেন্দ্রিকতার বদলে চীনকেন্দ্রিকতা গ্রহণ করা নয়। এমনও নয় যে, বাংলাদেশ ভারত, চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে বরং দেশ ও জাতির কল্যাণের জন্য এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে: বাংলাদেশ সবার সঙ্গে আছে কিন্তু কারও অধীন নয়। এটিই নতুন যুগের বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক আখ্যান। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের জন্য প্রয়োজন কঠোর শৃঙ্খলা, কখন আপস করতে হবে আর কখন শক্ত অবস্থানে থাকতে হবে তা বুঝতে পারা। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারত অপরিহার্য; অর্থনীতির জন্য চীন অপরিহার্য; এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য পশ্চিমা বিশ্ব অপরিহার্য।

গবেষক (এশিয়ান জেওইজি) 

—জা.অর্থনীতি/আইবিএম