নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া অনেক তথ্যই ভুল বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ। এসব তথ্য সংশোধনের আহ্বান জানিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রোহিঙ্গাদের সঠিক সংখ্যা জানতে জাতিসংঘ ব্যবস্থার অধীনে নিবন্ধিত তথ্যকে ভিত্তি হিসেবে নিতে হবে।
গতকাল মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত ইউ কিয়াও সো মোর সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরেন মহাপরিচালক (মিয়ানমার অনুবিভাগ) মো. তৌফিক-উর-রহমান। পরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বৈঠকের বিষয়গুলো জানানো হয়।
বৈঠকে দুই দেশের সম্মত কাঠামোর ভিত্তিতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে অনুরোধ করা হয়। এ সময় শরণার্থীশিবিরে জন্ম নেওয়া শিশু এবং ২০১৭ সালের পর রাখাইন থেকে জোর করে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদেরও এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশ বর্তমানে এসব রোহিঙ্গার নিবন্ধনের কাজ করছে। ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের প্রাথমিক তালিকার পর যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে, তাদের তথ্যও যথাসময়ে মিয়ানমারের কাছে দেওয়া হবে। যাচাই-বাছাইয়ের সময় এসব তথ্য সঠিকভাবে বিবেচনায় নেওয়ার জন্য মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত শনিবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বাংলাদেশ থেকে দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার তালিকা গত জুলাইয়ের শেষ নাগাদ যাচাই করা হয়েছে। দেশটির দাবি, যাচাই করা ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রাখাইনের বাসিন্দা ছিলেন।
মিয়ানমারের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া ৪ হাজার ২৪১ জন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন বলেও দাবি করেছে দেশটি। একই সঙ্গে রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার বিষয়টিও অস্বীকার করেছে মিয়ানমার।
বাংলাদেশ এসব তথ্যের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বলেছে, মিয়ানমারের বিজ্ঞপ্তিতে থাকা অনেক তথ্যই ভুল। রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে জাতিসংঘের অধীনে নিবন্ধিত তথ্যই সঠিক চিত্র তুলে ধরে বলে জানিয়েছে ঢাকা।
বৈঠকে তৌফিক-উর-রহমান আরও বলেন, রোহিঙ্গারা ‘বাঙালি’ নন। তাদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয় রয়েছে। মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষও সম্প্রতি পর্যন্ত তাদের এই পরিচয় স্বীকার করেছে।
এ সময় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের উদ্বেগ ও পর্যবেক্ষণ তার দেশের কর্তৃপক্ষকে জানাবেন বলে আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে যাচাই করা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করতে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া দ্রুত করার বিষয়ে তার সরকারের অঙ্গীকারের কথাও জানান।
বৈঠকে বাংলাদেশ আবারও বলেছে, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো তাদের নিজ ভিটেমাটি রাখাইনে নিরাপদ, সম্মানজনক ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের পর প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বাংলাদেশের হিসাবে, ওই সময় সীমান্ত পেরিয়ে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ৮ লাখের বেশি। এর আগে থেকেই কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতা থেকে বাঁচতে এসব রোহিঙ্গা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছেন। বর্তমানে তাদের বড় একটি অংশ কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থীশিবিরে বসবাস করছে।