ইসলামি চিকিৎসা ব্যবস্থায় ডুমুর

সুপরিচিত আন্তর্জাতিক ইসলামি চিন্তাবিদ ও লেখক ইউসুফ আলহাজ আহমাদ ইসলামি অনুশাসন, বিজ্ঞান ও পবিত্র কোরআনের সম্পর্ক এবং স্বাস্থ্য বিষয়ে অনেক গ্রন্থ লিখেছেন। তার লেখা সর্বাপেক্ষা পাঠকনন্দিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে একটি হলো ‘ইসলামিক পথ্য: উন্নত জীবনের চাবি’। এই গ্রন্থে কোরআন ও হাদিসের আলোকে প্রাকৃতিক উপায়ে সুস্থ থাকার উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আজ থাকছে গ্রন্থটির ডুমুর ফল বিষয়। 

ডুমুর হলো মহান আল্লাহর আশীর্বাদপূর্ণ ফল। আল্লাহ তায়ালা এই ফল নিয়ে শপথ করেছেন। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, শপথ ডুমুর ফলের এবং অলিভের। (সুরা আত তীন, ৯৫: ১-২)।

কোরআনের ব্যাখ্যাকারীরা এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, আয়াতে ডুমুর ও অলিভ হলো যেটা আমরা খাই। 

ইবনে আব্বাস আতা, জাবির ইবনে যায়েদ সবাই একই বর্ণনা দিয়েছেন।

কেউ কেউ অবশ্য বলেছেন যে আয়াতে ডুমুর বলে দামেস্কের মসজিদকে আর অলিভ বা জয়তুন বলে জেরুজালেমের মসজিদকে আল্লাহ তায়ালা বুঝিয়েছেন। কারও কারও মতে আয়াতে ডুমুর বলে জুদি পর্বতের কাছে নুহ (আ.) যে মসজিদ তৈরি করেছিলেন তাকে বোঝানো হয়েছে।

ইবনুল কাইয়ুম (রা.) বলেন, ‘ডুমুর যেহেতু হেজাজ অঞ্চলে তত বেশি পরিচিত না তাই এটাকে সুন্নাতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বরং এটা সামগ্রিকভাবে উপকারী বলে মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনেই এটাকে নিয়ে শপথ করেছেন। 

আয়াতে ডুমুর আর অলিভ নিয়ে শপথ করার কারণ হলো এই দুটোতেই মানুষের উপকারিতা আছে। এই দুটোতেই পর্যাপ্ত পরিমাণে মিনারেল, পুষ্টিগুণ ও ভিটামিন আছে। 

চার হাজার বছর আগে থেকেই ডুমুর মানব সভ্যতার কাছে পরিচিত। মানুষ ৪ হাজার বছর আগেই ডুমুরের চাষাবাদ করত। তাওরাত ও ইঞ্জিলে ডুমুর ফলের উল্লেখ পাওয়া যায়। সক্রেটিস, হোমার, প্লেটোসহ প্রাচ্যের অনেক জ্ঞানী ব্যক্তিও ডুমুর ফলের উল্লেখ করেছেন।

প্রাচীনকালে মিসরীয়রা এই দুটোকেই একসঙ্গে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করতেন। তারা মুখের মেছতায় কিংবা দাগ দূর করতেও এটাকে মলম হিসেবে ব্যবহার করতেন। ফারাওরা পাকস্থলীর ব্যথা দূর করতে ডুমুর ব্যবহার করতেন।

আল রাজি বলেন যে, ডুমুর পেটের এসিডিটি দূর করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আল মুয়ফফাক আল বাগদাদি বলেন, ফলের মধ্যে পুষ্টিগুণের জন্য ডুমুর উল্লেখযোগ্য। খালি পেটে ডুমুর খেলে বিশেষ উপকার পাওয়া যায়।

ইবনুল কাইয়ুম (রা.) বলেন যে, সাদা চামড়ার ডুমুরগুলো বেশি উপকারী। এটা কিডনির পাথর দূর করে, মূত্রথলিকে নানা রকম বিষাক্ত জীবাণু থেকে রক্ষা করে।

ডুমুরে আছে ভিটামিন বি১, বি২, সি এবং ভিটামিন এ। উচ্চমাত্রার পুষ্টিগুণও ডুমুর ফলে পাওয়া যায়। এছাড়া ডুমুর ফলে আয়রন, ক্যালসিয়াম, কপারসহ আরও অনেক পুষ্টির উপাদান রয়েছে।

ডুমুরে রয়েছে উচ্চমাত্রার ভিটামিন বি-১ যা স্নায়ুতন্ত্রকে সজীব রাখে। কোনো কোনো বিজ্ঞানী বলেছেন, এতে আছে ভিটামিন কে, যা শরীর রক্ত পরিশোধন ও রক্ত জমাট বাঁধতে সহায়তা করে। ডুমুর গাছের পাতা বা শাখা কিংবা ছাল কাটলে যে সাদা রঙের রস বের হয় সেই রস দুধের সঙ্গে মিশিয়ে লাই তৈরি করে ত্বকের আঁচিলে কিংবা ক্ষতে ব্যবহার করলে মহান আল্লাহর ইচ্ছায় উপকার পাওয়া যাবে।

ডুমুরে প্রচুর আঁশ থাকার কারণে এটা কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্যও বিশেষ উপকারী। বুকের কফ, শ্বাসকষ্ট দূর করতেও এটা কার্যকর ভূমিকা পালন করে। উচ্চ পুষ্টিগুণ থাকার কারণে শিশুদের ডুমুর খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়া শারীরিক দুর্বলতা, অস্থিরতা, স্নায়ুদৈর্বল্য রয়েছে, তাদের জন্যও এটা উপকারী। মাড়ির ক্ষয়রোধে এটা মাউথওয়াশ হিসেবে ব্যবহার করলে উপকার পাওয়া যায়

সারা বিশ্বে ডুমুরকে প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমেরিকার ন্যাশনাল মেরিল্যান্ড ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী জোনাথন হাটওয়েল ১৯৭০-এ লয়েডস ম্যাগাজিনে এক প্রবন্ধ লিখেছেন এ বিষয়ে। একইভাবে জাপানের ইচি জাকি হাসপাতালের চিকিৎসক এমকোচি তার এক গবেষণায় প্রতিষেধক হিসেবে ডুমুরের গুণাগুণ প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে ডুমুরের জুস মেলিগনেন্ট টিউমার সারাতে ভূমিকা রাখে। আরেকটি গবেষণায় ৫৭ জন রোগীর ওপর ডুমুরের এই চিকিৎসা প্রয়োগ করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৩২ জন পুরুষ আর ১৫ জন মহিলা ছিল। এই চিকিৎসা চলছিল দুই বছর পাঁচ মাস। এদের মধ্যে কারও কারও মুখের ক্যানসার ছিল। একটি নির্দিষ্ট সময় চিকিৎসার পর এই রোগীরা সুস্থতা লাভ করে।

(সূত্র: মুহাম্মদ মাহমুদ আব্দুল্লাহ, আল তিকবুল কোরআন গিধা ওয়া দাওয়া। কায়রো ১৯৮৯
ইবনুল জাওজি, জাদ আল মাসির ফিল ইলমুল তাফসির)