বিলীনের পথে চরমধুয়া গ্রাম, দুর্ভোগে পাঁচ শতাধিক পরিবার

শেরপুর প্রতিনিধি: শেরপুরের নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের চরাঞ্চলে অবস্থিত চরমধুয়া গ্রাম। চরাঞ্চল হওয়ায় গ্রামের নামের সঙ্গেও মিশে আছে চরাঞ্চলের পরিচয়। তবে সুন্দর এই গ্রামের মানুষের জীবন থেকে প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে শান্তি। মৃগী নদীর করাল গ্রাসে বিলীনের পথে গ্রামটি। নদীর অব্যাহত ভাঙনে একের পর এক পরিবার বসতভিটা হারাচ্ছে। কেউ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে নদী থেকে অনেক দূরে নতুন করে ঘর বাঁধছেন, আবার কেউ সামর্থ্যের অভাবে জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমাচ্ছেন রাজধানীতে। মৃগী নদীর চলমান ভাঙনের ফলে হুমকির মুখে পড়েছে পাঁচ শতাধিক পরিবার ও শত শত একর ফসলি জমি।

সূত্র জানায়, শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার মৃগী বিল হলো মৃগী (মিরগী) নদীর উৎসস্থল। নদীটি শেরপুর সদর ও নকলা উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে মিশেছে। চরমধুয়া এলাকায় এসে নদীটির ভাঙন জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। ফলে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। এ অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ধান, পাট, ভুট্টা ও সরিষার আবাদ হয়। এসব কৃষিপণ্য স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। তবে ঘন ঘন পাহাড়ি ঢল ও নদীভাঙনের কারণে গত কয়েক বছরে আগের মতো ফলন পাওয়া যাচ্ছে না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু নদীভাঙন নয়, এলাকাটিতে চলাচলের জন্য কোনো সড়কও নেই। পাকা সড়ক থেকে প্রায় তিন মাইল পর্যন্ত যে মাটির রাস্তাটুকু ছিল, সেটিও এখন আর নেই। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে রাস্তাটির বেশির ভাগ অংশ। বর্তমানে এই এলাকার কৃষিপণ্য পরিবহনের একমাত্র বাহন ঘোড়ার গাড়ি। জরুরি রোগীকে হাসপাতালে নিতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। অনেক সময় বেহাল যোগাযোগব্যবস্থা ও যানবাহনের সংকটের কারণে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রোগীর মৃত্যু হয়।

প্রায় তিন হাজার মানুষের বসবাস এই গ্রামে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ১৭ বছরে এখানে সরকারি কোনো উল্লেখযোগ্য সুযোগ-সুবিধা পৌঁছায়নি। তাদের দাবি, জামে মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান, বিদ্যালয়, গুচ্ছগ্রাম, কমিউনিটি ক্লিনিকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীভাঙনের হুমকিতে থাকলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

চরমধুয়া নামাপাড়া এলাকার বাসিন্দা সাফিকুল ইসলাম, আলম আলী, সায়েদ মিয়াসহ আরও কয়েকজন বলেন, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে মৃগী নদীর তীব্র ভাঙনে আমাদের গ্রামের মানুষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদীভাঙনের ফলে দুপায়ে চলার মতো একটি রাস্তাও আমাদের নেই। আমরা সরকারের দৃষ্টি কামনা করছি, যেন এই ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

এক ভুক্তভোগী নারী বলেন, আমার ৫-৬ কাঠা জমিসহ ঘরবাড়ি নদী কাইরা নিছে। প্রায় ৫ লাখ টাকার বাঁশঝাড় নদীতে বিলীন হয়েছে। বারবার অভিযোগ দিলেও সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

প্রাথমিক বিদ্যালয়পড়ুয়া এক শিশু বলে, স্কুল ভেঙে যাচ্ছে, রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে। আমাদের এখন চলাফেরা করতে ভয় করে।

নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহাঙ্গীর আলম দৈনিক জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, অতিবৃষ্টি এবং ঢলের কারণে নকলা উপজেলার মৃগী নদীর চরমধুয়া নামাপাড়া ও দড়িপাড়া এলাকায় তীব্র ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে মাননীয় সংসদ সদস্য, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসকসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে আমরা ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছি। ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছি।

শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুদীপ্ত চৌধুরী এই প্রতিবেদককে বলেন, মৃগী নদীর চরমধুয়া নামাপাড়া এলাকার সাড়ে আটশ মিটার ভাঙনকবলিত স্থান আমরা পরিদর্শন করেছি। ইতোমধ্যে শেরপুর জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া মাত্রই ভাঙনরোধে কাজ শুরু করা হবে।

—জা.অর্থনীতি/আইবিএম