ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র
পরিবেশ সারচার্জ হলো এক ধরনের অতিরিক্ত কর বা ফি যা ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি কমানোর লক্ষ্যে আরোপ করা হয়। এই ধরনের কর পৃথিবীর অনেক দেশে পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য দেওয়া হয়ে থাকে। বাংলাদেশ সরকার পৃথিবীর অন্যান্য দেশে প্রচলিত ইকোট্যাক্সকে পরিবেশ সারচার্জ কর আইনে সংযোজন করেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে এই কর প্রস্তাব করা হয়, যা ২০২৪-২৫ সালের অর্থবছরে সন্নিবেশ করা হয়। বাংলাদেশ অর্থ আইন ২০২৪ এ তফসিল-২ এর তৃতীয় অংশে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে।
পরিবেশ কর বিভিন্ন রকমের হতে পারে। যেমন- গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস করার লক্ষ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি, হাইড্রোকার্বন তেল, বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপর আরোপিত কর। এটাকে কার্বন ও জ্বালানি কর বলা হয়। আবার কোন কোন দেশে পরিবেশ সংরক্ষণের তহবিলের জন্য হোটেল বুকিংয়ের সময় বা অন্য দেশে প্রবেশের সময় কর ধার্য করা হয়। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিক্স ও প্যাকেজিংয়ের উপর কর আরোপ করা হয়, যাতে করে পুনর্ব্যবহার যোগ্য প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিক্স ও বর্জ্যের ব্যবহার উৎসাহিত হয়। এছাড়া দূষণকারী যানবাহন কমানোর লক্ষ্যে কর যেমন আরোপ করা হয় যানজট কমানোর জন্যও রয়েছে যানজট মাশুল।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত আয়কর পরিপত্র ২০২৪-২৫ এ পরিবেশ সারচার্জ পরিশোধের জন্য সাতটি শর্ত আরোপ করা হয়েছিল। যেমন একাধিক ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়ির ক্ষেত্রে গাড়ির উপর সর্বনিম্ন হারে পরিবেশ সারচার্জ আরোপিত হবে। বাকি গাড়ির উপর সারচার্জ পরিশোধ বাধ্যতামূলক হবে।
আরও পড়ুন: খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অপচয় রোধ করা প্রয়োজন
গাড়ির নিবন্ধনকারী বা ফিটনেস নবায়নকালে উৎসে পরিবেশ সারচার্জ সংগ্রহ করবে। একাধিক বছরের জন্য গাড়ি নিবন্ধন বা ফিটনেস নবায়ন করলে পরবর্তী অর্থ বছরগুলোর ৩০ জুন তারিখের মধ্যে পরিবেশ সারচার্জ বাধ্যতামূলক। একাধিক বছরের জন্য গাড়ির ফিটনেস বা নিবন্ধন নবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন দাখিলের আগে পরিবেশ সারচার্জ পরিশোধ না করলে কর কমিশনার আয়কর রিটার্ন প্রসেস বা কর নির্ধারণকালে সেটা আদায় করবেন। পরিবেশ সারচার্জ প্রত্যার্পণযোগ্য বা অন্য কোনও প্রকারের কর বা সারচার্জের সাথে সমন্বয়যোগ্য হবে না। মোটর গাড়ি বলতে পরিবেশ সারচাজর্রে ক্ষেত্রে বাস, মিনিবাস, কোস্টার, প্রাইম মুভার, ট্রাক, লরি, ট্যাংক লরি, পিকআপ ভ্যান, হিউম্যান হলার, অটোরিকশা, মোটর সাইকেল ব্যতীত অন্যান্য মোটরযান অন্তর্ভুক্ত হবে।
গত ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতয়ি সংসদে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের বাজেট উপস্থাপনকালে জানান, ব্যক্তিগত ব্যবহারের একাধিক মোটরযান থাকলে মালিককে পরিবেশগত সারচার্জ বা পরিবেশ কর দিতে হবে। এ সারচার্জ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) আদায় করবে। গাড়ির ফিটনেস, নিবন্ধন, বা পুনর্নিবন্ধন ফি পরিশোধের সময়ই এ কর পরিশোধ করতে হবে। বাজেট প্রস্তাবে ব্যক্তিগত মোটরযান বলতে বোঝানো হয়েছে প্রাইভেট কার, জিপ ও মাইক্রাবাসকে। পরিবেশ কর নির্ধারণ হবে একই মালিকের গাড়ির সংখ্যা ও গাড়ির ইঞ্জিন সক্ষমতা বা সিসি বা মোটরশক্তি( কিলোওয়াট) এর ভিত্তিতে।
আরও পড়ুন: পে স্কেল কার্যকর হলে বকেয়া বেতন কীভাবে পাবেন?
বাজেটে ১৫০০ সিসি বা ৭৫ কিলোওয়াট পর্যন্ত প্রতিটি গাড়ির জন্য পরিবেশ কর ২৫ হাজার টাকা, ১৫০০ সিসির বেশি কিন্তু ২০০০ সিসি বা ১০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত গাড়িরর জন্য ৫০ হাজার টাকা ও ২০০০ সিসির বেশি কিন্তু ২৫০০ সিস বা ১২৫ কিলোওয়াট পর্যন্ত গাড়িরর জন্য ৭৫ হাজার টাকা। ২৫০০ সিরি বেশি কিন্তু ৩০০০ সিসি বা ১৫০ কিলোওয়াট পর্যন্ত গাড়ির জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ৩০০০ সিসির বেশি কিন্তু ৩৫০০ সিসি বা ১৭৫ কিলোওয়াট পর্যন্ত গাড়িড়র জন্য ২ লাখ টাকা ও ৩৫০০ সিসি বা ১৭৫ কিলোওয়াটের বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়ির জন্য ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা কর নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পরিবেশ সারচার্জ অন্য কোন করের সঙ্গে সমন্বয়যোগ্য হবে না। ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ মোকাবিলা এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা উৎসাহিত করতেই এ সারচার্জ আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পরিবেশ সারচার্জ কার্বন কর নামেও পরিচিত। এই কর আরোপের উদ্দেশ্য থাকে জনগণকে কার্বন সম্পন্ন জ্বালানি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা। এটাকে প্রত্যাবর্তনশীল করও বলা যেতে পারে। কেননা এর মাধ্যমে গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে উত্তোলিত কর থেকে সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে। এই ধরনের কর আরোপ নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে। যেমন- শিল্প ক্ষেত্রে কর আরোপের ফলে জ্বালানি ব্যবহারকারী অনেক কোম্পানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার কমিয়ে দিলে যানবাহন শিল্প ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। যেমন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের অনেক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানি কার্বন করের বিরোধিতা করছে।
আরও পড়ুন: হুন্ডি: প্রবাসীর ক্ষুদ্র লাভ, দেশের বড় ক্ষতি
যে সমস্ত দেশে কার্বন কর চালু আছে, তারা হলো- জিম্বাবুয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, নিউজিল্যান্ড, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়যরর্যান্ড, হল্যান্ড, সুইডেন, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, কোস্টারিকা, কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে কানাডা, আয়ারল্যান্ড ও সুইডেনের মত বেশ কিছু দেশ প্রথম কার্বন কর ব্যবস্থা শুরু করে। সখোনকার প্রতষ্ঠিানগুলো কার্বন ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে কর দিতে থাকে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণ করতে কার্বন কর সবচেয়ে কার্যকরী উপায়। এটি অর্থনীতির উপর তেমনএকটা প্রভাব ফেলে না। এটি কার্যকরভাবে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস করে। এর ফলে সবুজ উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠে। এই ধরনের ব্যবস্থায় মানুষ পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন হয়। কার্বন উপাদানকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারে কর আরোপ করলে এর ক্ষতির উপর ক্ষতিপূরণ পাওয়া সম্ভব হয়। এতে মানুষ যেমন সচেতন হয়, তেমনি অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সমস্যার সমাধান যাওয়া যায়। এতে মানুষ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও যানবাহনের দিকে ঝুকবে। সিগারেটের উপর কর আরোপ করলে যেমন মানুষ সিগারেট কম ব্যবহার করবে বিষয়টা অনেকটা তেমনই। এটি যেমন শিল্প কারখানার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তেমনি প্রযোজ্য মোটরযানের ক্ষেত্রেও। জলবায়ুসংকট থেকে শুরু করে আবহাওয়া, তাপমাত্রা যে হারে বাড়ছে তাতে সরকারের উচিত কার্বন কর বা পরিবেশ সারচার্জের মত কর আরোপ করা।
লেখক: কর আইনজীবী ও পরিবেশ বিষয়ক লেখক।