নামে ফোরজি, কাজের বেলায় স্লো

অনলাইন ডেস্ক:  আজকের বিশ্বে দ্রুতগতির ইন্টারনেট আর কোনো বিলাসিতা নয়, এটি অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ৯ জনের মধ্যে ৩ জন মানুষ এখনো অনলাইনেই আসতে পারেনি।

মোবাইল ইন্টারনেটে যেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের গতি ৬৬১ মেগাবিট পার সেকেন্ড, সেখানে বাংলাদেশে এটি মাত্র ৪৩ মেগাবিট! আর ব্রডব্যান্ডে সিঙ্গাপুর ৪২১ এমবিপিএসে দৌড়াচ্ছে, সেখানে আমরা আটকে আছি মাত্র ৬৬ এমবিপিএসে। এমনকি ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া কিংবা থাইল্যান্ডও আমাদের চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে।

বর্তমান সরকার যেখানে 'ক্যাশলেস সোসাইটি' বা নগদহীন সমাজ গড়ার কথা বলছে, সেখানে ইন্টারনেটের এই ধীরগতি সবচেয়ে বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস, কিউআর কোড লেনদেন- সবকিছুই নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেটের ওপর। কিন্তু গতি না থাকলে লেনদেনে দেরি হয়, পেমেন্ট ফেল মারে, এমনকি একই টাকা দুবার কেটে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের আস্থা ভেঙে পড়ছে। ব্যাংক খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, শক্তিশালী ইন্টারনেট ছাড়া ক্যাশলেস সমাজ গড়া প্রায় অসম্ভব।

আমাদের রপ্তানি আয়ের প্রায় ১২ শতাংশ এখন ডিজিটালনির্ভর। অথচ ইন্টারনেটের এই দুরবস্থার কারণে ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, ক্লাউডভিত্তিক সেবা এবং ই-কমার্স ব্যাপকভাবে মার খাচ্ছে।

প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, ক্লাউড সার্ভিস কিংবা ইআরপি সফটওয়্যার স্লো হয়ে গেলে কাজের গতি ও উৎপাদনশীলতা দুই-ই কমে যায়। অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন কোনো দেশে আসেন, তারা আগে দেখেন সেখানকার ডিজিটাল সংযোগ কতটা উন্নত। ইন্টারনেটের দুর্বলতা আমাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকেও থমকে দিচ্ছে।

আইটি বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ৭-৮ বছরে আমাদের টেলিকম খাতে পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত বিনিয়োগই হয়নি। প্রতিবেশী দেশগুলো ফাইভজিতে চলে গেলেও আমরা ফোরজির গুণগত মান নিশ্চিত করতে পারিনি।

পাশাপাশি ডিভাইস ও ডেটা প্যাকেজের চড়া দাম এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব তো রয়েছেই। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেটের অবস্থা আরও করুণ। ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী টেলিহেলথ, ই-লার্নিং ও অনলাইন সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তৃতীয় সাবমেরিন ক্যাবল যুক্ত করা, ফাইভজি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং স্টারলিংকের মতো আধুনিক প্রযুক্তি দ্রুত চালু করা এখন সময়ের দাবি। ডিজিটাল ইকোনমিতে টিকে থাকতে হলে শুধু কভারেজ বাড়ালেই হবে না—গতি, স্থায়িত্ব এবং সুলভ মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। কারণ ইন্টারনেট থামলে, থমকে যাবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।