জেলেদের জালে ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজ চলাচল

সাইদুর রহমান, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বন্দরের আউটার অ্যাংকরেজ ও শিপিং চ্যানেলে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বসানো মাছ ধরার জালের কারণে জাহাজ চলাচল মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিদেশি মাদার ভেসেল থেকে শুরু করে দেশীয় লাইটার জাহাজ পর্যন্ত নিয়মিত এসব জালে আটকে পড়ছে। জালের মোটা রশি প্রোপেলার ও রাডারে জড়িয়ে প্রায় বন্ধ হচ্ছে জাহাজের ইঞ্জিন। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে বহিঃনোঙর এলাকায় রাতের নৌচলাচল (নাইট নেভিগেশন) বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা করছেন নৌপরিবহন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের অভিযোগ, বন্দরের আলফা, ব্রাভো ও চার্লি অ্যাংকরেজ এলাকায় জেলেরা স্থায়ীভাবে বড় আকারের জাল বসিয়েছেন। অনেক স্থানে জাল এমনভাবে বিস্তৃত যে কার্যত জাহাজ চলাচলের নির্ধারিত পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদে চলাচলের পরিবর্তে জেলেদের জাল এড়িয়ে পথ পরিবর্তন করে চলতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক সময় চলন্ত জাহাজকে জেলেদের নির্দেশনা মেনে নির্দিষ্ট পাশ দিয়ে যেতে হয়, যাতে তাদের জাল ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। 

নৌপরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আলফা অ্যাংকরেজ থেকে ব্রাভো, চার্লি হয়ে কুতুবদিয়া পর্যন্ত এবং পতেঙ্গা থেকে শিপিং চ্যানেল হয়ে হাতিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় অসংখ্য স্থায়ী জাল বসানো হয়েছে। দিনের বেলাতেই চলাচলের সময় এসব জালের মোটা রশি প্রোপেলার ও রাডারে জড়িয়ে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রোপেলার ও রাডারও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দিনের বেলাতেই যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে রাতের নেভিগেশন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। 

বর্তমানে বহিঃনোঙরে অবস্থানরত মাদার ভেসেলগুলো ২৪ ঘণ্টা পণ্য খালাস করতে পারে। কিন্তু রাতের নৌচলাচল বন্ধ হলে কার্যত প্রতিদিন অন্তত ১২ ঘণ্টা কার্যক্রম সীমিত হয়ে যাবে। এতে জাহাজের অবস্থানকাল বাড়বে, পণ্য খালাসে বিলম্ব হবে এবং বন্দরের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।

এ বিষয়ে মেডিটেরিয়ান শিপিং কোম্পানির (এমএসসি) হেড অব অপারেশন আজমির হোসাইন চৌধুরী  জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘দেশের সমুদ্রবন্দরের আউটার অ্যাংকরেজ ও জাহাজ চলাচলের রুটে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বোট, লাইটার জাহাজ এবং মাছ ধরার জাল ছড়িয়ে থাকার কারণে বড় বিদেশি জাহাজগুলো নিরাপদে চলাচল করতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে শত শত বোট ও জালের কারণে জাহাজের মাস্টাররা নির্ধারিত অবস্থান শনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছেন। এতে আন্তর্জাতিক শিপিং মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং দেশকে নিরাপদ সমুদ্রবন্দর হিসেবে মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘অনিবন্ধিত ও অনিয়ন্ত্রিত বোটের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। প্রায় দেড় বছর আগে আমাদের একটি বড় জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষে একটি বোট ডুবে যায়। অথচ ওই বোটে কোনো নেভিগেশনাল যন্ত্র, সিগন্যাল বা সতর্কীকরণ লাইট ছিল না। এ ধরনের ঘটনা বড় ধরনের প্রাণহানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটানোর আশঙ্কা তৈরি করছে।’

আজমির হোসাইন চৌধুরি আরও বলেন, ‘বিদেশি জাহাজের মাস্টাররা নিয়মিত অভিযোগ করছেন যে বাংলাদেশে জাহাজ পরিচালনা ও নোঙর করে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। এই সমস্যা শুধু বন্দর কর্তৃপক্ষের একার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বয়ে একটি সুস্পষ্ট গাইডলাইন প্রণয়ন করতে হবে। কোন বোট কোথায় চলবে, কোথায় অবস্থান করবে এবং জাহাজ চলাচলের চ্যানেল ও রুট কীভাবে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখা হবে, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘বড় বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করা আমাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে আমরা একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছি।’

চট্টগ্রাম বন্দর সীমা, বহির্নোঙর ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথে নৌ-নিরাপত্তা জোরদার এবং নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ কঠোর নির্দেশনা দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) গত বৃহস্পতিবার ওই বিজ্ঞপ্তি জারি করে। বিজ্ঞপ্তিতে বহির্নোঙরে অবস্থানরত জাহাজগুলোকে আইএসপিএস কোড কঠোরভাবে অনুসরণ, অ্যাংকর ওয়াচ বজায় রাখা, ভিএইচএফ চ্যানেল ১৬ ও ১২ সার্বক্ষণিক মনিটরিং, নিয়মিত ডেক প্যাট্রোল এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা আলোকসজ্জা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পোর্ট কন্ট্রোলের অনুমতি ছাড়া কোনো সার্ভিস বোট, ফ্রেশ ওয়াটার বার্জ বা অন্য কোনো নৌযানকে জাহাজের পাশে ভিড়তে না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সৈয়দ রেফায়েত হামিম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। এখানে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সম্প্রতি বহির্নোঙর ও জাহাজ চলাচলের পথে অননুমোদিত নৌযানের চলাচল, অবৈধভাবে মাছ ধরার জাল স্থাপন এবং জাহাজে অনুপ্রবেশের মতো ঘটনা বাড়ায় নৌ-নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ কারণে বিদ্যমান আইন ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বন্দর কর্তৃপক্ষ এককভাবে নয়, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, নৌপরিবহন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। জাহাজ চলাচলের চ্যানেল নিরাপদ ও বাধামুক্ত রাখা এবং আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনের আস্থা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২ অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’