ফরিদপুর প্রতিনিধি: ফরিদপুরে পদ্মা নদীর ভাঙন পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ ও আশঙ্কাজনক রূপ ধারণ করেছে। গত প্রায় এক মাস ধরে চলা তীব্র ও ধারাবাহিক ভাঙনে ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে কয়েক কিলোমিটার এলাকা। নদীপাড়ের শত শত একর ফসলি জমি, গাছপালা ও বসতভিটা হারিয়ে পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন চরাঞ্চলের হাজারো মানুষ।
ভাঙনের এই তীব্রতা বাড়ায় চরম আতঙ্কে দিন কাটানো নদীতীরের বাসিন্দারা জরুরি ভিত্তিতে তাদের ঘরবাড়ি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। একই সঙ্গে ভাঙনের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক, মসজিদ ও গুচ্ছগ্রামসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা। জেলার সদর ও সদরপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল জুড়ে বর্তমানে পদ্মার এই করাল গ্রাস চলছে।
ফরিদপুর সদর উপজেলার পদ্মার তীরবর্তী নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের ইউসুফ মাতুব্বরের ডাঙ্গী, আসমত আলীর ডাঙ্গী থেকে শুরু করে মৃধাডাঙ্গী এলাকা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এখন তীব্র ভাঙন চলছে। দীর্ঘদিনের এই ভাঙনে শত শত একর জমির পাট, তিল ও ইরি ধান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা এখন পুরোপুরি সর্বস্বান্ত। ভাঙনকবলিত এলাকা থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে অবস্থিত চর টেপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর টেপুরা কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউসুফ মাতুব্বরের ডাঙ্গী জামে মসজিদ বর্তমানে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। ভাঙনের মুখে পড়ে কৃষক শাহাবুদ্দিন শেখসহ চরের বহু বাসিন্দা তাদের ঘরদোর ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদী থেকে অবাধে বালু লুট, অপরিকল্পিত ড্রেজিং এবং স্থায়ী বাঁধ না দেওয়ার কারণেই প্রতিবছর তাদের এভাবে ভিটেমাটি হারাতে হচ্ছে। অন্যদিকে, সদরপুর উপজেলার আকোটের চর ইউনিয়নের শয়তানখালী ও ছলেনামা গ্রাম এলাকায় নতুন করে ভাঙন দেখা দেওয়ায় চরম ঝুঁকিতে রয়েছে আকোটের চর গুচ্ছগ্রামটি। এখানকার প্রায় দুই শতাধিক পরিবার নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় এখন নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।
পদ্মার এই ভয়াবহ ভাঙন পরিস্থিতি নিয়ে মাঠ পর্যায়ে তদারকি করছেন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা হলেন— সদরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শরীফ শাওন, ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া এবং ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চরাঞ্চলের এই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও ভাঙনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদারকি করে জরুরি ভিত্তিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। একই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত ও নিঃস্ব হওয়া পরিবারগুলোর তালিকা তৈরি করে দ্রুত সরকারি সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, ইতোমধ্যে ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে, যাতে চর টেপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক ও মসজিদসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষা পায়।
চরাঞ্চলের এই বিস্তীর্ণ ভাঙন প্রতিরোধে শুধু জিও ব্যাগ ফেলা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; তাই নর্থ চ্যানেল এবং আকোটের চরের এই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা জুড়ে খুব শিগগিরই একটি দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নদীপাড়ের ভাগ্যবিড়ম্বিত হাজারো মানুষের এখন একটাই প্রত্যাশা— প্রতি বছর বর্ষা এলে সাময়িক জোড়াতালির কাজ না করে সরকার যেন দ্রুত একটি স্থায়ী টেকসই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি