মাদকাসক্তি: তারুণ্যের হাত ধরেই বদলাবে সমাজ
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

রফিকুল ইসলাম

"চলো সবাই শপথ করি, গড়বো নতুন দেশ, / মাদকমুক্ত হবে প্রাণ, জাগবে নৈতিক রেশ। / সচেতনতার আলো জ্বালো ঘরে ঘরে আজ, / তারুণ্যের হাত ধরেই বদলাবে সমাজ।"

সেটিরই প্রতিধ্বনি সম্প্রতি লক্ষ করা গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমের সংবাদে। মাদকের ভয়াল থাবা থেকে তরুণ সমাজ ও পরিবারকে রক্ষা করতে দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। স্থানীয় সচেতন নাগরিক, জনপ্রতিনিধি ও যুবসমাজ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।

কেননা, ক্রমবর্ধমান মাদকাসক্তির জন্য পারিবারিক ও সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হয়ে পড়ছে। ঘর, কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বন্ধুমহল সর্বত্রই এখন মাদকের বিস্তার। এতে নানা রকম অপরাধও বাড়ছে; বাড়ছে সামাজিক সংকট। তাই মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি এই ধরনের সামাজিক আন্দোলন অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখছে।

মাদকের বিস্তার ঠেকাতে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলা এবং সমাজজুড়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারলেই মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।

প্রত্যেক এলাকায় এ ধরনের কোনো উদ্যোগ শুরু করতে এখনই সময়। এতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও যুবকদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে প্রথমে সচেতনতামূলক প্রচার শুরু করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে তরুণদের সচেতন করে তোলাই হবে মাদক প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

বর্তমানে সমাজ ও দেশের জন্য মাদকাসক্তি একটি মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদকের নীল নেশার বিশাল থাবা বিস্তার করে চলেছে এ দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। 

এ এক তীব্র নেশা। হাজার হাজার তরুণ এ নেশায় আসক্ত। এ মরণনেশা থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করা না গেলে এ হতভাগ্য জাতির পুনরুত্থানের স্বপ্ন অচিরেই নিভে যাবে।

আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য অংশ আজ এই সর্বনাশা মরণনেশার কবলে। যে তারুণ্যের ঐতিহ্য রয়েছে সংগ্রামের, প্রতিবাদের, যুদ্ধ জয়ের; আজ তারা নিঃস্ব হচ্ছে মরণনেশার করাল ছোবলে। মাদক নেশার যন্ত্রণায় ধুঁকছে শত-সহস্র তরুণ প্রাণ। ঘরে ঘরে সৃষ্টি হচ্ছে হতাশা। ভাবিত হচ্ছে সমাজ।

মাদকাসক্তি শুধু একজন ব্যক্তির সমস্যা নয়; এটি পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক সংকট। মাদকের কারণে পারিবারিক সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে। অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। তাই মাদক প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক নজরদারি এবং নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা জোরদার জরুরি।

এছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা, মানবিক মূল্যবোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের চর্চা বাড়াতে হবে। পরিবার ও শিক্ষকদের সম্মিলিত ভূমিকা এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।

মাদকাসক্তি একটি স্নায়ুবিক ক্রিয়া। এর প্রভাবে ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা ও আচার-আচরণে অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হয়। মাদকদ্রব্যের প্রতি আসক্তি যুব সম্প্রদায়ের এক আদিম প্রবণতা। শাব্দিক অর্থে মাদকাসক্তি বলতে ড্রাগ বা মাদকদ্রব্যের প্রতি এক প্রবল আকর্ষণকে বোঝায়।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, নেশা এমন একটি মানসিক বা শারীরিক অবস্থা, যার সৃষ্টি হয়েছে জীবিত প্রাণি ও মাদক ওষুধের মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে।

মাদক শব্দের অর্থ হলো – মত্ততা জন্মায় এমন দ্রব্য। অর্থাৎ নেশা সৃষ্টিকারী দ্রব্যকেই মাদকদ্রব্য বলে। আফিম, হিরোইন, ফেনসিডিল, ইয়াবা, মদ এবং গাজার মতো দ্রব্যগুলোই সাধারণত মাদক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

মাদকদ্রব্য গ্রহণের ফলে স্নায়ুবিক বৈকল্য দেখা দেয় ও বারবার ওই দ্রব্য গ্রহণের প্রতি আসক্তির সৃষ্টি হয়। মাদকদ্রব্য গ্রহণের মাধ্যমেই কেবল এ আসক্তি প্রশমিত হয়। অন্যথায় শরীরে উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।

পৃথিবীতে যত মারাত্মক সমস্যা রয়েছে, তার শীর্ষে রয়েছে মাদকাসক্তি। বাংলাদেশ পৃথিবীর দুটি বৃহৎ মাদক পাচার রুটের মধ্যে পড়েছে। এ কারণে বাংলাদেশ মাদক পাচারের কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীতে প্রায় ৫০ কোটি মাদকাসক্ত ব্যক্তি রয়েছে। আইসিডিডিআরবির ‘জার্নাল অব হেলথ পপুলেশন অ্যান্ড নিউট্রিশন' (জেএইচপিএন)–এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ।

তবে অনেকের দাবি, এটি ৭০ লাখ। আবার অনেকের মতে, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা কোটির কোঠা ছাড়িয়ে গেছে; আর বর্তমানে দেশ ছয়লাব হয়ে গেছে।

জেএইচপিএনের তথ্যমতে, আসক্তদের ৭৯.৪ শতাংশ পুরুষ, ২০.৬ শতাংশ নারী; বন্ধুদের প্ররোচনায় মাদক নেয় ৮৫.৭ শতাংশ; মাদক গ্রহণকারীদের ৫৬.১ শতাংশ বেকার বা ছাত্র এবং ৯৫.৪ শতাংশ ধূমপায়ী।

একটি পরিবারে বা সমাজে কিংবা রাষ্ট্রে অশান্তি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিই যথেষ্ট। কোনো পরিবারে একজন মাদকাসক্ত থাকলে সেই পরিবারে নরক নেমে আসে। এ ব্যাপারে ইসলামের মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মাদকদ্রব্য সম্পর্কে বলেছেন, নেশা জাতীয় যে-কোনো দ্রব্যই মদ, আর যাবতীয় মদই হারাম। পবিত্র বেদে সব ধরনের নেশা ও মদ্যপানকে কঠোরভাবে নিষেধ এবং নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। বেদে মাদকদ্রব্যকে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক ক্ষতির কারণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

অথচ সকল প্রকার নেশা জাতীয় দ্রব্য হারাম হওয়া সত্ত্বেও এসব দ্রব্যসামগ্রীর প্রতি মানুষের দুর্বার আকর্ষণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ‘মাদকাসক্তি হচ্ছে চিকিৎসা গ্রহণযোগ্য নয় এমন দ্রব্য অতিরিক্ত পরিমাণে ক্রমাগত বিক্ষিপ্তভাবে গ্রহণ করা এবং এসব দ্রব্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া।'

সাম্প্রতিককালে আন্তর্জাতিক ড্রাগ ব্যবসায়ীরা নানা ধরণের মাদকের ব্যবসা ফেঁদেছে। এসব মাদকের ব্যবহার পদ্ধতিও নানারকমের। ধূমপানের পদ্ধতি, নাকে শোকার পদ্ধতি, ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে ত্বকের নিচে গ্রহণের পদ্ধতি এবং সরাসরি রক্তপ্রবাহে অনুপ্রবেশকরণ পদ্ধতি। বিভিন্ন রকম ড্রাগের মধ্যে হেরোইন আজ সব নেশাকেই ছাড়িয়ে গেছে। এর আসক্তি অত্যন্ত তীব্র। নিছক কৌতূহলে যদি কেউ হেরোইন সেবন করে তবে এই নেশা সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো তার ঘাড়ে চেপে বসে।

সমাজে মাদকের প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ধ্বংসাত্মক।এটি শুধু একজন ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যই নষ্ট করে না, বরং এর বিষাক্ত ছোবলে ভেঙে পড়ে পারিবারিক শান্তি; বৃদ্ধি পায় সামাজিক অপরাধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় সামগ্রিক অর্থনীতি ও জাতীয় অগ্রগতি।

মাদক বা ড্রাগস হলো বিষধর সাপের বিষাক্ত ছোবলের মতো, যা প্রতিনিয়ত একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে তার দংশনে নিঃশেষ করে দেয়। যার প্রভাব আমরা আমাদের যুব সমাজে বেশি দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমরা কখনো ভেবে দেখেছি কি যুব সমাজের এই পরিণতির জন্য অনেকাংশে দায়ী শুধুমাত্র মাদক দ্রব্য এবং মাদকাসক্তি সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান না থাকার কারণে!

ইউনাইটেড নেশনস অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম (ইউএনওডিসি) বলেছে, মাদক গ্রহণের ফলে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া গেলেও এই ক্ষণস্থায়ী স্বস্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর এক ফাঁদ। এ ফাঁদে একবার জড়ালে স্বাস্থ্যহানি ঘটে, সৃজনীশক্তি শেষ হয়ে যায়। 

এখানে ‘স্বাস্থ্যহানি’ বলতে কেবল দৈহিক স্বাস্থ্যের কথা বলা হচ্ছে না। দেহের পাশাপাশি বিশৃঙ্খল ও বিধ্বস্ত হয়ে যায় মনের স্বাস্থ্য, পুড়ে যায় আধ্যাত্মিক ও নৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক চিত্রে নেমে আসে দুর্যোগ।

তাই অচিরেই এই মাদকাসক্তির কারণ উদ্ঘাটন করে এর প্রতিকার জরুরি। আমাদের সমাজে বিভিন্ন কারণে মাদকাসক্তির প্রভাব লক্ষ করা যায়:

১. মস্তিষ্কে এক বিশেষ ধরনের প্রটিনের পরিমাণ কম থাকা এবং মলিকিউলার মেকানিজমের ফলে মাদকাসক্তি দেখা যায় বলে এক সমীক্ষায় জানা গেছে।

২. মাদকাসক্তদের মস্তিষ্কে GAT-3 প্রোটিনের পরিমাণ কম থাকায় তারা তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

৩. মস্তিষ্কের আনন্দ কেন্দ্র ও আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী রাসায়নিকের (যেমন: ডোপামিন) স্বাভাবিক ভারসাম্যহীনতা।

৪. বেকারত্ব ও জীবনে ব্যর্থতার কারণে সৃষ্ট গভীর হতাশা থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে গিয়ে অনেকেই মাদকে জড়িয়ে পড়ছে।

৫. মাদকাসক্তির জন্য সঙ্গদোষ আরেকটি মারাত্মক কারণ। নেশাগ্রস্ত বন্ধু-বান্ধবের মাধ্যমে এটি বিস্তার লাভ করে।

৬. কৌতূহলও মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ। অনেকেই মাদকাসক্তির ভয়াবহতা জেনেও কৌতূহলী হয়ে মাদকদ্রব্য গ্রহণ করে।

৭. বিষণ্ণতা, অতিরিক্ত উদ্বেগ বা চাপ থেকে মুক্তি পেতে অনেকে সাময়িকভাবে মাদকের আশ্রয় নেয়।

৮. অনেক সময় মানুষ মাদককে আনন্দ লাভের সহজ উপায় হিসেবে মাদক গ্রহণ করে এবং ধীরে ধীরে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে।

৯. মনস্তাত্ত্বিক বিশৃঙ্খলা তরুণদের মধ্যে মাদক গ্রহণের জন্য এটি অন্যতম কারণ। পরীক্ষায় ফেল, পারিবারিক কলহ, প্রেমে ব্যর্থতা, বেকারত্ব ইত্যাদি কারণে তারা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে।

১০. রোমাঞ্চপ্রিয়তা থেকে তরুণ বয়সে নতুন কিছু বা নিষিদ্ধ কিছুর প্রতি অতিরিক্ত কৌতূহল।

১১. অনেক সময় শুধু কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে বা বন্ধুদের অনুকরণ করে তরুণরা প্রথম মাদক গ্রহণ করে, যা পরে স্থায়ী আসক্তিতে পরিণত হয়।

১২. ধর্মীয় মূল্যবোধ মানুষকে সচেতন করে তোলে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে ধর্মীয় মূল্যবোধের বিচ্যুতি হওয়ার ফলে মাদকাসক্তির বিস্তার বৃদ্ধি পেয়েছে।

১৩. বংশগত প্রবণতায় অর্থাৎ পরিবারে পিতা-মাতা বা পূর্বপুরুষদের মাঝে মাদকের ইতিহাস থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে আসক্তির ঝুঁকি বেড়ে যায়।

১৪. দেশে মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতার কারণে মাদকাসক্তদের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে।

১৫. বন্ধুদের চাপ, পারিপার্শ্বিক কারণ, ব্যর্থতা এমনকি মাদক নিয়ে স্মার্ট হওয়ার প্রবণতাও অনেককে ঠেলে দেয় মাদকের জগতে।

এছাড়া সামগ্রিকভাবে আদর্শহীনতা, বিভ্রান্তি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ইত্যাদি কারণে মাদকাসক্তির সংখ্যা দিন দিন বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

মাদকাসক্তির প্রভাব

১. মাদক সেবন শরীরের স্নায়ুতন্ত্র ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে, ফলে লিভার সিরোসিস ও ক্যান্সারের মতো রোগ হয়।

২. মাদকাসক্ত ব্যক্তির স্মৃতিশক্তি হ্রাস পায়, মেজাজ খিটখিটে হয় এবং চরম মানসিক বিষণ্নতা দেখা দেয়।

৩. মাদক মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক আনন্দ ও পুরস্কারের অনুভূতিকে নষ্ট করে ফেলে, যার ফলে মাদক ছাড়া অন্য কোনো কিছুতে তারা তৃপ্তি পায় না।

৪. পরিবারে আর্থিক অনটন, অশান্তি সৃষ্টি হয় এবং পারিবারিক সম্মান ধুলিসাৎ হয়।

৫. মাদক কেনার জন্য অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হয়, যা মেটাতে অনেক আসক্ত ব্যক্তি পরিবারের সঞ্চয় নষ্ট করে বা চুরি করতে বাধ্য হয়।

৬. অপরাধ প্রবণতা, খুন, ছিনতাই ও ধর্ষণের মতো সামাজিক অপরাধের হার বৃদ্ধি পায়।

৭. শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় চরম অমনোযোগিতা আসে এবং একপর্যায়ে তারা স্কুল-কলেজ থেকে ঝরে পড়ে।

৮. মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করতে পারে না। যার ফলে অনেকেই চাকরি হারায়।

৯. মাদকাসক্তি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে।

১০. মাদকে সংক্রামক ব্যাধির বিস্তার ঘটে। একই সিরিঞ্জ বা সুই একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করার ফলে এইচআইভি বা হেপাটাইটিসের মতো প্রাণঘাতী রোগ ছড়ায়।

১১. মাত্রাতিরিক্ত মাদক গ্রহণ বা আত্মহত্যাজনিত কারণে অনেক তরুণ অকালেই মৃত্যুবরণ করে।

মোদ্দাকথা, মাদকাসক্তির কারণে একটি সুখী পরিবার খুব দ্রুত ধ্বংসের মুখে পতিত হয়। মাদকের পেছনে অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে আসক্ত ব্যক্তি পরিবারকে নিঃস্ব করে ফেলে। অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের জমানো টাকা বা ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করে মাদকের খরচ জোগাড় করা হয়। 

সেইসাথে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে চরম হতাশা, আতঙ্ক এবং মানসিক অশান্তি বিরাজ করে। পারিবারিক কলহ ও দাম্পত্য অশান্তি বেড়ে যাওয়ার ফলে অনেক সময় বিবাহবিচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটে।

মাদক ও অপরাধ একে অপরের পরিপূরক। মাদকের টাকা জোগাড় করতে মানুষ খুন, ছিনতাই, চুরি ও ডাকাতির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তরুণ সমাজ বিপথগামী হয়ে কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। আবার মাদকের নেশায় মাতাল হয়ে অনেকে স্ত্রী ও সন্তানদের ওপর নির্মম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাচ্ছে।

মাদকের ব্যবহার এখন জাতীয় সমস্যারূপেই বিবেচিত হচ্ছে। মুনাফালোভী ব্যবসায়ী, ক্ষমতালোভী, দুর্নীতিবাজ, তথাকথিত রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা - এরা প্রত্যেকেই এই ভয়াবহ অবস্থার জন্য দায়ী। সবাই মিলে সংগঠিতভাবে এদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। নইলে জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব বজার রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

মাদক পাচার, সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব মূলত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর। প্রচলিত পন্থায় সফল না হয়ে সরকার এখন বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে। মাদক নির্মূলে যেকোনো পদক্ষেপকে আমরা সাধুবাদ জানাই। 

তবে এ রকম পদক্ষেপে মানবাধিকার বা আইনের যাতে লঙ্ঘন না হয়, তা দেখতে হবে। মাদক নির্মূলে প্রয়োজন এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা, সক্ষমতা, বিশ্বাসযোগ্যতা আরও বাড়িয়ে তোলা। স্থায়ীভাবে ওই অপরাধীদের দমন করে রাখা ও ‘ভয়ের' মধ্যে রাখতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই।

মাদকাসক্তি কোনো অপরাধ নয়, এটি একটি মানসিক ও শারীরিক রোগ। সঠিক চিকিৎসা, পারিবারিক ভালোবাসা এবং সামাজিক সমর্থনের মাধ্যমে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে পুরোপুরি সুস্থ করে সমাজে পুনর্বাসন করা সম্ভব।

মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণে পরিবার ভূমিকা রাখতে পারে। এ জন্য সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা আলাপ–আলোচনা করতে হবে, তাদের দীর্ঘক্ষণ একাকী রাখা যাবে না। সন্তানদের সঠিকভাবে তত্ত্বাবধান করার পাশাপাশি পারিবারিক ‘নিয়ম-রীতি’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। 

এছাড়া বিদ্যালয়গুলোও মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে যা করণীয়: শিক্ষার্থীদের ক্রোধ, আক্রমণাত্মক আচরণ নিয়ন্ত্রণ শেখানো; সমস্যা সমাধানের দক্ষতা শেখানো; ভালোভাবে যোগাযোগ করতে সক্ষম করে তোলা; মাদকসহ যেকোনো অবাঞ্ছিত আহ্বানকে ‘না’ বলতে শেখানো; মাদকবিরোধী মনোভাব তৈরি; সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা শেখানো।

মাদকাসক্তি একটি ‘সামাজিক ব্যাধি’। তাই এটির মূলোৎপাটন করতে হলে প্রবল সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজন। বর্তমানে সমাজে যে সাড়া জেগেছে, একে পুঁজি করে এ আন্দোলনকে আরও জোরালো করতে হবে ও সামনে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। 

তরুণ-তরুণীদের উদ্দেশে বলতে চাই, মাদককে ‘না’ বলতে দ্বিধা করবে না; তোমার হয়ে অন্যকে সিদ্ধান্ত নিতে দেবে না; মন্দ বন্ধুদের সঙ্গ ত্যাগ করে ভালো বন্ধুদের সঙ্গে সংযোগ বাড়িয়ে দাও; মা-বাবা ও মুরব্বিদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সংযোগ দৃঢ় করো; পারিবারিক ‘নিয়ম-রীতি’ মেনে চলো; মাদক ছাড়াই জীবনকে উপভোগ করতে ধর্মীয় মূল্যবোধ ধারণ করতে শেখো; সংগীত, খেলা, শিল্পকলা, সমাজসেবায় নিয়োজিত থাকো; মাদক নিয়ে যে মিথ্যা ভুল ধারণা, মিথ রয়েছে, সেগুলো জানো।

মাদকাসক্তি একটি ‘সামাজিক ব্যাধি’। তাই এটির মূলোৎপাটন করতে হলে প্রবল সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজন। বর্তমানে সমাজে যে সাড়া জেগেছে, একে পুঁজি করে এ আন্দোলনকে আরও জোরালো করতে হবে ও সামনে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

আমরা সেইদিন মাদকবিরোধী আন্দোলনে সফল হবো, যেদিন সকলে মিলে সুস্থ জীবনবোধের চেতনায় উদ্ভাসিত হয়ে গেয়ে উঠতে পারব -

"প্যাথিড্রিন, হেরোইন, নেশার আস্তানা, / দুমড়ে মুচড়ে দিতে ধরো হাতখানা। / চলো প্রতিরোধ গড়ে তুলি প্রতিবিশ্বের প্রান্তর জুড়ে, / মরণ আসে যদি তবু  পিছু ফেরোনা।"

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা