ফয়সাল সিকদার, বরগুনা: বরগুনার তালতলী-ঢাকা আঞ্চলিক সড়ক দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে বেহাল অবস্থায় রয়েছে।
সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দ সৃষ্টি হওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন দুর্ভোগে পড়ছেন যাত্রী ও চালকরা। সেই সঙ্গে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা এবং কমে যাচ্ছে পর্যটকের সংখ্যা।
স্থানীয়দের দাবি, তালতলী-ঢাকা আঞ্চলিক সড়কের দ্রুত ও টেকসই সংস্কার না হলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে এবং পর্যটন খাতেও নেতিবাচক প্রভাব অব্যাহত থাকবে।
তালতলী উপজেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগের অন্যতম প্রধান সড়ক এটি। ঢাকা-কুয়াকাটা সড়ক থেকে তালতলী উপজেলার সোনাকাটা পর্যন্ত এর দৈর্ঘ্য ৩৫ কিলোমিটার। তবে চলাচলের উপযোগী রয়েছে মাত্র ৯ কিলোমিটার। বাকি ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘদিন টেকসই সংস্কারের অভাবে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ভাঙাচোরা সড়কে চলাচলের সময় যাত্রীরা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে রোগী পরিবহনে দেখা দিচ্ছে বাড়তি ভোগান্তি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এ সড়কে চলাচল করতে গিয়ে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়েন। সড়কটির বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে আহত হচ্ছেন যাত্রী ও পথচারীরা। পাশাপাশি সড়কের উঁচু-নিচু অবস্থার কারণে যানবাহনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় গাড়ি বিকল হয়ে দিনের পর দিন সড়কে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এতে বাড়ছে পরিবহন ব্যয় ও জ্বালানি খরচ।
তালতলী উপজেলার করইবাড়ী এলাকার অ্যাম্বুলেন্সচালক মনির হোসেন বলেন, 'তালতলী হাসপাতাল থেকে যেসব রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পটুয়াখালী অথবা বরিশালে পাঠানো হয়, তাদের এই সড়ক দিয়েই যেতে হয়। কিন্তু সড়ক ভাঙা থাকায় খুব ধীরে ধীরে যেতে হয়। এতে যাতায়াতের সময় বেশি লাগে এবং রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। অনেক রোগী পথেই অ্যাম্বুলেন্সে মারা যান।'
উপজেলার বেহালা গ্রামের বাসিন্দা বনানী রানী বলেন, 'এই সড়ক দিয়ে চলাচল করতে খুব কষ্ট হয়। আমরা সুস্থ মানুষরাও অসুস্থ হয়ে পড়ি। এছাড়া সব সময় ভয় থাকে, কখন গাড়ি কাত হয়ে দুর্ঘটনার শিকার হই।'
ট্রাকচালক আউয়াল মৃধা বলেন, 'এই সড়ক দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মালামাল পরিবহন করি। কিন্তু রাস্তা ভাঙাচোরা থাকায় চরম দুর্ভোগে আছি। গাড়ির টায়ার, স্প্রিং ও চাকার রিম নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় উঁচুনিচু স্থানে চাকা আটকে গিয়ে দিনের পর দিন রাস্তায় পড়ে থাকতে হয়। জ্বালানি খরচও বেড়ে যায়। দ্রুত সড়কটি সংস্কারের দাবি জানাচ্ছি।'
সড়কের বেহাল অবস্থার প্রভাব পড়েছে তালতলীর পর্যটন খাতেও। এ উপজেলার অন্যতম আকর্ষণ দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমি ট্যাংরাগিরি ইকো পার্কসহ কয়েকটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। এসব স্থানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকরা ভ্রমণে এলেও যাতায়াতের একমাত্র ভরসা এই সড়ক। ভোগান্তিকর যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে অনেক পর্যটক তালতলীমুখী হচ্ছেন না বলে জানান স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটন-সংশ্লিষ্টরা।
বরগুনা জেলা ট্যুরিস্ট ম্যানেজমেন্টের সভাপতি আরিফ রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, 'তালতলী উপজেলার সম্ভাবনাময় পর্যটন স্পটগুলো এখন পর্যটকশূন্য হয়ে পড়ছে শুধু এই সড়কের দুরবস্থার কারণে। এই রাস্তা দিয়ে একবার এসে ভোগান্তির শিকার হলে অনেক পর্যটক দ্বিতীয়বার আসতে চান না। পাশাপাশি তারা অন্যদেরও এ ভোগান্তির কথা জানান। ফলে নতুন পর্যটকরাও আসতে আগ্রহ হারান। রাষ্ট্রের অবহেলার কারণে তালতলীর পর্যটন স্পটগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে গেছে। সরকারকে অনুরোধ করব, পর্যটন খাত রক্ষার স্বার্থে হলেও দ্রুত সড়কটি সংস্কার করা হোক।'
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অতীতে একাধিকবার সড়কটি সংস্কার করা হলেও নিম্নমানের কাজের কারণে তা বেশিদিন টেকেনি। অল্প সময়ের মধ্যেই সড়ক আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। ফলে বারবার জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। তারা সড়কটির গুরুত্ব বিবেচনায় ভারী যানবাহন চলাচলের উপযোগী করে টেকসইভাবে পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
তারিকাটা এলাকার বাসিন্দা মো. রহমান তালুকদার বলেন, 'সড়কটি যখন নতুন করে নির্মাণ করা হয়, তখনই নির্মাণে ত্রুটি ছিল। আমতলীর কয়েকজন প্রভাবশালী ঠিকাদার প্রভাব খাটিয়ে যেনতেনভাবে কাজ করেন। ফলে নির্মাণের কয়েক মাসের মধ্যেই সড়কটি ভেঙে যেতে শুরু করে। পরে কয়েকবার সংস্কার করা হলেও তা টেকেনি। তাই বারবার সংস্কারের নামে টাকা অপচয় না করে গুরুত্ব বিবেচনায় একবারেই টেকসইভাবে সড়কটি পুনর্নির্মাণ করা উচিত।'
এ বিষয়ে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বরগুনার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান খান জানান, 'সড়ক সংস্কারের জন্য এলজিইডির মেইনটেন্যান্স বিভাগে একাধিকবার বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। তবে এখনো প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। আম্ফান নামের একটি প্রকল্পে সড়কটি সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, আগামী জুলাই-আগস্ট মাসের মধ্যে বরাদ্দ পাওয়া গেলে সংস্কারকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।'
—জা. অর্থনীতি/এনজে