ভারতে ৪৫ দিনে ২৩টি মসজিদ, মাদসারা ও ঈদগাহ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে
ছবি: সংগৃহীত

ভারতে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উপাসনালয় ও স্থাপনা ভাঙার এক নজিরবিহীন ঢেউ শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘মুসলিম মিরর’-এর অনুসন্ধানী তথ্যে উঠে এসেছে, গত মে মাস থেকে মাত্র ৪৫ দিনে দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, রাজস্থান ও হরিয়ানায় অন্তত ২৩টি মসজিদ, মাদরাসা, দরগাহ ও ঈদগাহ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

অধিকারকর্মী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, উচ্ছেদ অভিযানের নামে কোনো প্রকার আইনি প্রক্রিয়া বা পূর্ব নোটিশ ছাড়াই বেছে বেছে মুসলিমদের শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। অন্যদিকে, একই এলাকায় অননুমোদিতভাবে গড়ে ওঠা হিন্দু ধর্মীয় স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ অক্ষত রাখা হয়েছে।

মুসলিম মিরর-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেঙে পড়া স্থাপনাগুলোর মধ্যে শত বছরের প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শনও রয়েছে।
গত ৬ মে দিল্লির মঙ্গোলপুরীতে প্রায় ২০০ বছরের পুরনো ‘দরগাহ পঞ্চ পীরান’ বিপুল পুলিশ মোতায়েন করে ভেঙে ফেলা হয়। এর মাত্র দুই সপ্তাহ পর, ২১ মে পিতমপুরায় বিজেপির স্থানীয় বিধায়ক করনাইল সিং-এর নেতৃত্বে উগ্রপন্থী এক জনতা একটি নির্মাণাধীন মাদ্রাসার প্রাচীর ভেঙে ফেলে।

গত ২ জুন উত্তর প্রদেশের বারাণসীতে রেলওয়ে সম্প্রসারণের অজুহাতে প্রায় ২০০ বছরের পুরনো আজগাইব শহীদ মসজিদটি ভেঙে ফেলা হয়।

৩-৪ জুনের রাতে পুনেতে প্রায় ১০০ বছরের পুরনো ‘হযরত শামসুদ্দিন কাদরী দরগাহ’ রাতারাতি গুঁড়িয়ে দেয় পৌর কর্তৃপক্ষ, যা স্থানীয়ভাবে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল।

উত্তর প্রদেশের সম্ভলে ৫০০ বছরের পুরনো একটি দরগাহ এবং দৌলতপুর খান এলাকার একটি ঈদগাহের সীমানা প্রাচীর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

অভিযানগুলোর প্রশাসনিক বৈধতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা বা নগরায়নের অজুহাত দেওয়া হলেও, স্থানীয়দের দাবি—তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই দেওয়া হয়নি।

গত ৮ জুন রাজস্থানের জয়পুরে ৪ দশকের পুরনো ‘নূরানী মসজিদ’ রাস্তা প্রশস্ত করার নামে ভাঙার আগে পুরো এলাকার ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং ৩,০০০ পুলিশ কর্মী মোতায়েন করা হয়। ওয়াকফ বোর্ডের নিবন্ধিত সম্পত্তি হওয়া সত্ত্বেও এটি ভাঙা হয়। একইভাবে, ১৮ জুন রাজস্থানের বারমেরে কৃষি জমিতে গড়ে ওঠার অভিযোগে মাত্র একদিনের নোটিশে ৪টি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়।

সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনাটি ঘটে সম্ভলের ‘মসজিদ মোস্তফা কাদরী’তে। ৬ জুন মসজিদটি ভাঙার পর, ভেতর থেকে ‘আমি মুহাম্মদকে ভালোবাসি’ লেখা পোস্টার উদ্ধারের অভিযোগে মসজিদের তত্ত্বাবধায়কসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উস্কানির মামলা দেয় পুলিশ।

ভারতে দ্রুতগতিতে মসজিদ ভাঙার এই প্রবণতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘জাস্টিস ফর অল’। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সম্ভল, বারাণসী ও জয়পুরের গুরুত্বপূর্ণ মসজিদগুলো ধ্বংস করা ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর চরম আঘাত। তারা ভারতের নাগরিক সমাজকে এই ‘ঘৃণার রাজনীতি’র বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

ভারতে ‘বুলডোজার অ্যাকশন’ এখন শুধু জমি উদ্ধারের প্রশাসনিক হাতিয়ার নয়, বরং এটি সংখ্যালঘু মুসলিমদের অবদমন এবং দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার সাংবিধানিক কাঠামোকে ধ্বংস করার এক রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। শতবর্ষী ঐতিহ্য ধ্বংসের এই প্রক্রিয়া ভারতের কোটি কোটি মুসলিমের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে।

মুক্তচিন্তার দরবারে কিছু জরুরি প্রশ্ন-

  • উন্নয়ন নাকি বৈষম্য? যে উচ্ছেদ অভিযানে শত বছরের পুরনো মসজিদ রাতারাতি ধুলোয় মেশে, অথচ পাশের অন্য ধর্মীয় স্থাপনা অক্ষত থাকে—তাকে আইনের শাসন বলা চলে কি?
  • সংবিধান কি কেবলই কাগজে? যদি রাষ্ট্রীয় বুলডোজার একটি জনপদের ধর্মীয় আত্মপরিচয়কেই গুঁড়িয়ে দেয়, তবে সেখানে নাগরিকের 'ধর্মীয় স্বাধীনতা' আর অবশিষ্ট থাকে কী করে?
  • ভবিষ্যতের পরিণতি কী? সংখ্যালঘুদের ওপর চলা এই পরিকল্পিত দমনপীড়নকে আজ আমরা মুখ বুজে মেনে নিলে, কাল কি বিশ্বের অন্য কোথাও আরেকটি সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব এভাবে বিপন্ন হওয়ার পথ সুগম হচ্ছে না?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার দায় আজ শুধু ভারতের নয়, বরং সারা বিশ্বের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের।

জা. অর্থনীতি/ উমার