পথিক ইসলাম: ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা! ভাষা, সংস্কৃতি কিংবা রাজনীতির সীমারেখা পেরিয়ে এই খেলা কোটি কোটি মানুষকে এক সুতোয় বেঁধেছে। কিন্তু এই বিশাল আয়োজনের নেপথ্যে রয়েছে একটি নাম-ফিফা। বিশ্বকাপের উত্তেজনা, ফুটবল তারকাদের মহিমা, কোটি মানুষের উন্মাদনা কিংবা বৈশ্বিক ফুটবল রাজনীতির কেন্দ্রে সবসময়ই থাকে এই সংস্থা। ফুটবল মাঠে খেলেন ফুটবলাররা, কিন্তু মাঠের বাইরের সবচেয়ে বড় খেলাটি পরিচালনা করে ফিফাই।
১৯০৪ সালের ২১ মে ফ্রান্সের প্যারিসে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা ফিফা। তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, ছোট্ট একটি সংগঠন একদিন বিশ্ব ক্রীড়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। প্রতিষ্ঠার সময় সদস্য ছিল মাত্র সাতটি দেশ-বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড। পরে ধীরে ধীরে বিশ্বের নানা দেশ এতে যুক্ত হতে থাকে। দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেয় ১৯০৮ সালে, আর্জেন্টিনা ও চিলি ১৯১২ সালে এবং কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র ১৯১৩ সালে সদস্য হয়। বর্তমানে ফিফার সদস্য দেশের সংখ্যা ২০৯।
সুইজারল্যান্ডের জুরিখ শহরে অবস্থিত ফিফার প্রধান কার্যালয় এখন বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র। এখান থেকেই পরিচালিত হয় ফুটবলের বৈশ্বিক প্রশাসন, বিশ্বকাপ আয়োজন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার পরিকল্পনা এবং কোটি কোটি ডলারের অর্থনীতি।
ফিফার মূল পরিচয় বিশ্বকাপ আয়োজনের মধ্য দিয়ে। চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, এটি এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক উৎসবগুলোর একটি। পুরুষ বিশ্বকাপের পাশাপাশি নারী বিশ্বকাপও আয়োজন করে ফিফা। এছাড়া ফুটসাল ও সৈকত ফুটবলের মতো ভিন্ন ধারার ফুটবলও এই সংস্থার অধীনে পরিচালিত হয়।
তবে অনেকের ভুল ধারণা, ফিফাই ফুটবলের নিয়ম তৈরি করে। বাস্তবে ফুটবলের নিয়মকানুন নির্ধারণ করে আলাদা একটি আন্তর্জাতিক বোর্ড। ফিফা মূলত সেই নিয়ম অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাগুলোর আয়োজন ও ব্যবস্থাপনা করে থাকে।
ফিফার প্রথম সভাপতি ছিলেন রবার্ট গেরিন। বর্তমানে সংস্থাটির নেতৃত্বে আছেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদককে ঘিরেই পরিচালিত হয় ফিফার প্রশাসনিক কাঠামো। বিশাল এই সংস্থায় শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন। আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সুবিধার জন্য ফিফার চারটি সরকারি ভাষা রয়েছে- ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান ও স্প্যানিশ।
বিশ্বকে কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য ফিফা সদস্য দেশগুলোকে কয়েকটি আঞ্চলিক অঞ্চলে ভাগ করেছে। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, উত্তর ও মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং ওশেনিয়া— এই ছয় অঞ্চলের মাধ্যমে পরিচালিত হয় বিশ্ব ফুটবলের কাঠামো!
ফিফার ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল অলিম্পিকে আন্তর্জাতিক ফুটবল আয়োজন। ১৯০৮ সালে লন্ডন অলিম্পিকে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতা আয়োজন করে সংস্থাটি। এরপর থেকেই বিশ্ব ফুটবলে ফিফার কর্তৃত্ব বাড়তে থাকে।
বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়দের স্বীকৃতি দিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ফিফা। বছরের সেরা ফুটবলার নির্বাচন, বিশেষ পুরস্কার প্রদান কিংবা স্মরণীয় গোলের স্বীকৃতি- সবই এখন ফুটবল সংস্কৃতির অংশ। দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়কে দেওয়া হয়েছে ব্যালন ডি’অর সম্মাননা। পাশাপাশি রয়েছে পুসকাস পুরস্কার যা দেওয়া হয় বছরের সেরা গোলদাতাকে। এছাড়া বিশেষ অবদানের জন্য দেওয়া হয় সভাপতির বিশেষ সম্মাননা।
ফিফা শুধু প্রতিযোগিতা আয়োজনেই সীমাবদ্ধ নয়, ফুটবলের ইতিহাস সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯৯৪ সালে সংস্থাটি ঘোষণা করে বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা দল। সেখানে জায়গা পান পেলে, ডিয়েগো ম্যারাডোনা, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, জোহান ক্রুইফ, গ্যারিঞ্চা, লেভ ইয়াশিনদের মতো কিংবদন্তিরা। পরে ২০০২ সালে ঘোষণা করা হয় ‘স্বপ্নের দল’।
২০০৪ সালে ফ্রান্স ও ব্রাজিলের মধ্যকার ‘শতাব্দীর ম্যাচ’ আয়োজন করেও বিশ্ব ফুটবলে নতুন মাত্রা যোগ করে ফিফা। এমন আয়োজনগুলো শুধু খেলাকে জনপ্রিয় করেনি, ফুটবলকে বিশ্ব সংস্কৃতির অংশে পরিণত করেছে।
তবে ফিফার পথচলা সবসময় আলোয় মোড়া ছিল না। নানা সময়ে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, স্বাগতিক নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক কিংবা ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সমালোচনার মুখেও পড়েছে সংস্থাটি। তবুও বিশ্ব ফুটবলের কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে ফিফার প্রভাব এতটাই গভীর যে, এই সংস্থাকে ছাড়া আধুনিক ফুটবল কল্পনাই করা যায় না।
একসময় কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের ছোট উদ্যোগ হিসেবে শুরু হয়েছিল ফিফার যাত্রা। এখন সেটিই পরিণত হয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ক্রীড়া সংস্থাগুলোর একটিতে। বিশ্বকাপের প্রতিটি গোল, প্রতিটি উল্লাস, প্রতিটি অশ্রু কিংবা প্রতিটি ইতিহাসের পেছনে তাই কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছে একটি নাম- ফিফা!