বিশ্বকাপে রোনালদো ও মেসির দেখা পেলাম
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

মাইদুল আলম বাবু: ফুটবল ভক্তদের কাছে বড় নাম ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসি। এই দুজন অনেক কিছু দিয়েছেন। অনেক স্মৃতি তাদের নিয়ে। ক্লাব তো বটেই দেশের হয়েও উজাড় করে দিয়েছেন। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে তাদের দেখা পাওয়া যাবে। শুধু ভক্ত ও অনুরাগীদের জন্য নন; রিপোর্টাররাও এই দুজনের সাক্ষাতের চেষ্টা করেন। আমি বাংলাদেশ থেকে ২০১৮ সালে রাশিয়া ও ২০২২ এ  কাতারে যাই ফুটবল বিশ্বকাপ কাভার করতে। আর ম্যাচ কাভারের সময় এই দুজনের দেখা পাই সেখানে।

ফুটবলাররা যখন ক্লাব ও দেশের ম্যাচ খেলতে যান তখন কঠোর নিয়মে থাকেন। এজন্য রিপোর্টার ও ভক্তদের সেভাবে সময় দিতে পারেন না। আর ছুটিতে তারা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান। আর সিকিউরিটি ও গেম অফিসিয়ালদের ফাঁকি দিয়ে কাছে যাওয়া বেশ কঠিন।

মস্কোতে ১৮ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ ছিল রাশিয়া ও সৌদি আরবের। চমৎকার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে রাশিয়ার আধিপত্য দিয়ে শেষ হয় খেলা। আমি এরপর স্পেন ও পর্তুগালের ম্যাচ দেখতে সোচি রওনা দেই। ১৬৪১ কিলোমিটার পাড়ি দেই বিমানে। বলে নেওয়া ভালো কার্ডিফে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে এর আগে ২০১৭ সালে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে দেখেছি। বিশ্বকাপে প্রথম দেখতে যাই তাকে।

আমি তখনও জানতাম কি? এক অবিশ্বাস্য হ্যাটট্রিক ও বিখ্যাত সেই ফ্রি—কিক থেকে তিনি গোল করবেন। বাংলাদেশে তখন রোজার ঈদের ছুটি শুরু হয়েছে। রাতে ছিল ম্যাচ। বাংলাদেশের আরও দুজন রিপোর্টার ওই ম্যাচে ছিলেন। পবিত্র কুণ্ডু ও মুন ছিলেন রোনালদোকে দেখতে। টিভি ক্যামেরায় রোনালদোকে দেখা আর সামনে থেকে দৌড়ানো দেখার অভিজ্ঞতা পুরো আলাদা। ওভাবে কোনো মানুষকে আমি দৌড়াতে বা ছুটতে দেখিনি। পুরো গ্যালারি ৯০ মিনিট একটা থ্রিলার দেখেছে। রোনালদোর হ্যাটট্রিক সে ম্যাচে। পর্তুগাল সেই ফ্রি কিক গোলে স্কোর লাইন ৩-৩ কলে ফেলে। ম্যাচ শেষে উত্তেজনা। আমি মিডিয়া জোনে যাই যদিও কারও বক্তব্য পাই সেই আশায়। স্পেনের রামোস, পিকে কে সামনে থেকে দেখলাম। দিয়েগো কস্তা সে ম্যাচে অবিশ্বাস্য খেলেছেন। পর্তুগাল টিম বের হয়েছে। সবার শেষে আসলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তিনি আসতে পুরো মিডিয়া চুপ হয়ে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে ছিল। একটা হাসি ও চোখ টিপে চলে গেলেন। আমি অবাক হলাম। এমন একটা ম্যাচ খেলার পর একটা মানুষ তরতাজা থাকে কীভাবে? কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চলে গেলেন তিনি।

সোচিতে রাত কাটিয়ে পরের দিন মস্কো ফিরে আসলাম। এয়ারপোর্টে দেখলাম আর্জেন্টিনা আইসল্যান্ডের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছে। আমি সেইন্ট পিটার্সবার্গে নাইজেরিয়া ও আর্জেন্টিনার ম্যাচ পছন্দে রেখেছিলাম। রাশিয়ার বিখ্যাত ইলেকট্রিক ট্রেনে গেলাম। সে ম্যাচে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে জেতে। মেসিকে ম্যাচ শেষে মিডিয়া জোনে দেখলাম। এমন ভদ্র কোনো মানুষ হতে পারে ধারণা ছিল না। মাথা নিচু করে বিনীত হয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন তিনি। যারা পত্রিকার ও অনলাইন রিপোর্টার তাদের ছবি তোলা নিষেধ। তাই সেলফি নেওয়ার ইচ্ছা পূরণ হলো না। এরপর ওই বিশ্বকাপে পর্তুগাল ও মরক্কোর ম্যাচ দেখলাম। ওটাই রোনালদোর দেখা আমার শেষ ম্যাচ।

২০২২ সালে দোহায় আসলাম। ঘানার ম্যাচ দেখতে গেলাম। এই ম্যাচে রোনালদো গোল পান। মিডিয়া জোনে আমি ও মানবজমিনের এডিটর মতিউর রহমান চৌধুরী ছিলেন। ব্রুনো ফার্নান্দেজ ও বার্নাডো সিলভার সঙ্গে কথা হলো। ছবিও তুললাম। অপেক্ষা আর ফুরায় না। এরপর রোনালদো আসলেন। আমি শুধু ক্যামেরা ঘুরিয়েছি। এ সময় তিনি কাঁধে হাত রাখেন। ওই সময়টা মাথা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। রিপোর্টার হিসেবে একটি প্রশ্ন রাখতে পারি— কোন ক্লাবে যাবেন। রোনালদো এক জায়গায় বেশি সময় থাকতে পারেন না। থামার সঙ্গে সঙ্গে সবাই প্রশ্ন শুরু করেন।

তারপর রোনালদোর বিদায় হলো সে বিশ্বকাপে। যার খেলা ২০০৭ থেকে দেখি তাকে সামনে থেকে দেখব ভাবিনি।

এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দোহার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রেনিং করেছে। আমি কাভার করতে যাই সে ট্রেনিং। মেসি এই দলটির প্রাণ। তিনি সবার ভালোবাসার দলে। যখন ট্রেনিং শুরু হয়। তখন তিনি হাসি খুশিতে মেতে থাকেন। এজন্যই বোধহয় এই দলটি সেবার দিয়েগো ম্যারাডোনার পর চ্যাম্পিয়ন হয়। মেসি রিপোর্টার সামনে কম আসেন ট্রেনিংয়ের সময়। মাঝে মাঝে এসেছেন। আমি ছবির সুযোগ পেলেও সেবার সাহস করিনি। ফিফার কিছু নিয়ম আছে। আন-অথোরাইজড কেউ ছবি নিতে পারেন না। আমার অবশ্য ক্ষতি নেই। বিশ্ব ফুটবলের সেরা দুজনকে দেখার তৃপ্তি তো ছিলই। আর ফাইনালে মেসির সব কিছু আমি দেখেছি। তার পরিবার সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে। এটা মেসির জীবনের স্বপ্ন ছিল। স্বপ্নও সত্যি হয়।