সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার সুস্বাদু গোবিন্দভোগ, হিমসাগর ও ল্যাংড়া আমের সুনাম দেশজুড়ে। আর হিমসাগর আম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। দেশজুড়ে এই আমের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও এতদিন দূর-দূরান্তে আম পাঠাতে গিয়ে বেসরকারি কুরিয়ার খরচের ধাক্কায় হিমশিম খেতে হতো সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের। অনেক সময় আমের দামের চেয়ে কুরিয়ার খরচই হয়ে যেত দ্বিগুণ।
তবে এবার সেই চিরায়ত ভোগান্তি ও বেসরকারি কুরিয়ারের নানা অনিয়ম দূর করে অবিশ্বাস্য সাশ্রয়ী মূল্যে ও শতভাগ নিরাপত্তায় আম পরিবহনের দারুণ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ডাকবিভাগ।
প্রযুক্তি-নির্ভর ‘স্পিড পোস্ট’ সার্ভিসের মাধ্যমে এখন নামমাত্র খরচে সাতক্ষীরার আম পৌঁছে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ডাকবিভাগের এই ডিজিটাল, আধুনিক ও বিশ্বস্ত সেবায় এখন উচ্ছ্বসিত সাতক্ষীরার আমচাষি, উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষ।
বেসরকারি কুরিয়ারে আম চুরি ও অনিয়মে বিপাকে তরুণ উদ্যোক্তারা
যেখানে সরকারি ডাক বিভাগ আম পরিবহনে স্বস্তি এনে দিয়েছে, সেখানে বেসরকারি কিছু নামী-দামী কুরিয়ার সার্ভিসের চরম অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতায় বিপাকে পড়েছেন আম ব্যবসায়ীরা। অনেক উদ্যোক্তা ও ক্রেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের ক্ষোভ ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ তুলে ধরেছেন।
সাতক্ষীরার আম ব্যবসায়ী ও জনপ্রিয় ব্লগার রাহাত রাজা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্টিড ফাস্ট কুরিয়ার সার্ভিস তরুণ আম ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের অনলাইনে আম বিক্রয়ের অন্যতম পছন্দের মাধ্যম হলেও ঈদের আগ মুহূর্তে সাতক্ষীরার আম সময়মতো ডেলিভারি না হওয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে আমের লট হারিয়ে যাওয়ার কারণে বহু উদ্যোক্তা আজ চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কুরিয়ার সার্ভিসের অনলাইন সেবায় যোগাযোগ করলে বারবার শুধু 'স্যার দেখছি' বলে সময় পার করা হয়। কিন্তু বাস্তবে সমস্যার কোনো সমাধান মেলে না। একটি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের এমন দায়িত্বহীনতা তরুণ উদ্যোক্তাদের ব্যবসা ও স্বপ্ন-দুটোকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সাতক্ষীরা হাবের নাম্বার সারাদিন বন্ধ থাকে, জোনাল ম্যানেজার ফোন রিসিভ করেন না। আম পচে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই।
শুধু একটি প্রতিষ্ঠানই নয়, সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের বিরুদ্ধেও উঠেছে চুরির অভিযোগ।
কুমিল্লার বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মারুফ জানান, সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে সাতক্ষীরা থেকে আম আসার পরে আমার ক্যারেট থেকে কিছু আম বের করে নেওয়া হয়েছে।
এইসব বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য অভিযুক্ত বেসরকারি কুরিয়ারের সাতক্ষীরা হাবের জোনাল ম্যানেজার গোলাম রসুলের ফোনে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
আশার আলো ‘পোস্ট অফিস’
পানির দামে দ্রুততম ডেলিভারি: বেসরকারি কুরিয়ারগুলোর এই চুরির আতঙ্ক ও চরম অব্যবস্থাপনার বিপরীতে সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ।
সাতক্ষীরা প্রধান ডাকঘর সূত্রে জানা গেছে, ডাক বিভাগের বিশেষ ‘স্পিড পোস্ট’ সার্ভিসে আম বুকিংয়ের খরচ অবিশ্বাস্য রকম কম।
বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসগুলো যেখানে প্রতি কেজিতে ১৩ থেকে ২০ টাকা বা তারও বেশি চার্জ নিচ্ছে, সেখানে ডাকবিভাগের এই রেট আমূল পরিবর্তন এনেছে। হিসাব অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক ২০ কেজি আম পাঠালে তার মোট খরচ পড়ছে ভ্যাট ও উৎস করসহ মাত্র ১১৬ টাকা। ফলে আমের মূল্যের চেয়ে কুরিয়ার খরচ বেশি হওয়ার সমস্যা এখন অতীত।
কম খরচের পাশাপাশি ডাকবিভাগের দ্রুততম ডেলিভারির বিষয়টি নজর কেড়েছে ব্যবসায়ীদের। সকালে বুকিং করলে ওইদিন সন্ধ্যার মধ্যেই খুলনায় আম পৌঁছে যাচ্ছে। বুকিং করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা শহরের গ্রাহক আম হাতে পাচ্ছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বুকিংয়ের এক থেকে দুই দিনের মধ্যে আম পৌঁছে যাচ্ছে।
সরকারি সেবায় শতভাগ নিরাপত্তা ও গ্রাহক সন্তুষ্টি: ডাক বিভাগের এই আধুনিক ও নিরাপদ সেবা পেয়ে কুড়িগ্রামের আম ক্রেতা আরিফুল ইসলাম রিগান অত্যন্ত আনন্দিত।
তিনি বলেন, পোস্ট অফিস সার্ভিস পেয়ে খুব ভালো লেগেছে, খুব দ্রুত আম পেয়েছি। অন্যান্য কুরিয়ার সার্ভিসের ব্যাপারে শুনেছি আম বের করে নেয়। কিন্তু পোস্ট অফিসে যারা কাজ করেন, তারা সরকারি চাকরি করেন। সামান্য কিছু আমের জন্য তারা চাকরি হারাবেন না-এই দায়িত্ববোধ তাদের মাথায় রাখতে হয়। তাই পোস্ট অফিসের সেবাই সবচেয়ে নিরাপদ।
সাতক্ষীরা প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার দেবাশীষ কর্মকার বলেন, আমরা ‘স্পিড পোস্ট’ এর মাধ্যমে অত্যন্ত কম মূল্যে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। সরকারি এই সেবার মূল উদ্দেশ্যই হলো আমাদের প্রান্তিক আমচাষি ও তরুণ অনলাইন উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়ানো, যাতে কুরিয়ার খরচের কারণে তাদের লোকসান গুনতে না হয়। গ্রাহকদের আম যেন সম্পূর্ণ অক্ষত, তাজা এবং সুরক্ষিত অবস্থায় নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছায়, সেজন্য আমাদের কর্মীরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা সততা ও জবাবদিহিতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি, যাতে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা ডাক বিভাগের ওপর তাদের পূর্ণ আস্থা ফিরে পান।
—জা.অর্থনীতি/এনজে
