আহমেদ ফেরদাউস খান, ঢাকা: ব্যাংক খাতে চলমান সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আলোচিত পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক সম্মিলিত ব্যাংক কাঠামোর মধ্যেই রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা, তারল্য পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং পরিচালন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
গত ২৭ এপ্রিল পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজল্যুশন’ বিল নিয়ে আলোচনার মধ্যেই ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ থেকে বেরিয়ে শেয়ারের মালিকানা ফেরত পাওয়ার আবেদন করেছেন সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের (এসআইবিএল) সাবেক পাঁচ পরিচালক।এই আবেদনের পরই দুর্দশাগ্রস্ত পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক টিকবে কিনা সেই প্রশ্নও উঠে। তবে এসব প্রশ্ন উড়িয়ে দিয়ে একীভূতকরণ বা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন না আনার ব্যাপারে সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘যদিও একটি ব্যাংক ইতোমধ্যে পৃথক হতে আবেদন করেছে, হয়ত আবেদনের অপেক্ষায় আছে আরেকটি ব্যাংক। যেই পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হলো স্বাভাবিকভাবেই ওই ব্যাংকগুলোর আগের উদ্যোক্তা পরিচালকেরা মালিকানায় ফিরতে চাইবে। এটা স্বাভাবিক। সাড়ে ৭ শতাংশ শেয়ারের জন্য ডাউন পেমেন্ট দিয়ে তাদের আবারও মালিকানা ফেরত পাওয়ার দাবি করার সুযোগ রয়েছে। এর অর্থ এই না যে কেউ সাড়ে ৭ শতাংশ দেওয়া মাত্রই তার মালিকানা ফেরত পাবে। পরিচালক হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য যে প্রসেস বাংলাদেশ ব্যাংক ফলো করে সেসব ক্ষেত্রে উত্তীর্ণ হলেই কেবল তারা পরিচালক হিসেবে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ রয়েছে।
একীভূত হওয়া দুর্বল পাঁচ ব্যাংক আপাতত পৃথক করা হচ্ছে না জানিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মালিকানা সরকারের হাতে রয়েছে। সরকার বলছে তারা কিন্তু স্থায়ীভাবে মালিকানা গ্রহণ করেনি। এই পাঁচটি আমানতকারীদের ব্রিথিং স্পেস দেওয়ার জন্য এবং ব্যাংকগুলোর স্বাস্থ্য ভালো করার জন্য সরকার সাময়িকভাবে দায়িত্ব নিয়েছে। পরে প্রাইভেট সেক্টরের প্রকৃত ইনভেস্টরদের হাতে একীভূত পাঁচ ব্যাংক আবার ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু এখনই বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও জানিয়েছেন, পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার বিষয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত আর পরিবর্তনের সুযোগ নেই। গত সোমবার ব্যাংক উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সঙ্গে বৈঠকে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার বিষয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত আর পরিবর্তনের সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে এমন কোনো সিদ্ধান্ত যদি নিতে হয়, তাহলে সব পক্ষের মতামত নিয়ে করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আলোচিত পাঁচটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে পৃথক পর্যবেক্ষণ টিম কাজ করছে। এসব ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি, ঋণ আদায়, মূলধন পর্যাপ্ততা এবং পরিচালন কাঠামো নিয়মিত মূল্যায়ন করা হচ্ছে। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিশেষ সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে। তবে আপাতত এসব ব্যাংককে আলাদা ব্যবস্থাপনায় নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে ব্যাংক খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে হঠাৎ কোনো কঠোর বা বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে ধাপে ধাপে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং সুশাসন নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাও ব্যাংক খাত সংস্কারে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পুনরুদ্ধারের কৌশল গ্রহণে জোর দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ইতোমধ্যে ব্যাংক খাত সংস্কারে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশেষ নিরীক্ষা, পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, অনিয়মিত ঋণ বিতরণের তদন্ত এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার করা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ব্যাংকের হিসাব ও মূলধন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর গ্রাহকদের মধ্যে যাতে উদ্বেগ তৈরি না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইতোমধ্যে আমানতকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত আমানত ১ লাখ ৯৩ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৭৭ শতাংশ। বিপুল অঙ্কের এ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা সঞ্চিতিতে ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৫০১ কোটি টাকা। পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে শতাংশের হিসাবে সর্বোচ্চ ৯৮ শতাংশ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ইউনিয়ন ব্যাংকে। এই হার ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে ৯৬ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৯৫ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী শরিয়ায় ৬২ শতাংশ ও এক্সিম ব্যাংকে ৪৮ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, একীভূত অবস্থায় পরিচালনার ফলে ব্যয় সাশ্রয়, সম্পদের কার্যকর ব্যবহার এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সহজ হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রাহকদের আমানত ও বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখতেও এটি সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, দীর্ঘ মেয়াদে এই একীভূত কাঠামো কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সুশাসন নিশ্চিত করা, স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের মেয়াদে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সমস্যায় পড়া পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেয় সরকার। এই পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। সেটির জন্য প্রাথমিকভাবে ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন জোগান দেয় সরকার। তবে নতুন এই ব্যাংকের মূলধন হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘সারা বিশ্বে রেগুলেশন হয় তিনটা টুলের মাধ্যমে। একটা হচ্ছে- একটা ব্যাড ব্যাংক ক্রিয়েট করে ব্যাংকগুলোর ব্যাড অ্যাসেটগুলো সেখানে দেওয়া। দ্বিতীয়টা হলো, ব্যাংকের সিকিউরিটি বা ব্যাংকের শেয়ার সেল করে দেওয়া। তিন নম্বর হচ্ছে, ব্যাংকের অ্যাসেটগুলোকে আলাদাভাবে ডিভাইড করে ওগুলা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কাছে হ্যান্ডওভার করা। সারা পৃথিবীতে তিনটাই চলে। আমাদের আইনের মধ্যে বলা আছে, ব্যাড ব্যাংক ক্রিয়েট করে তার কাছে এগুলা দেওয়া হবে। কিন্তু একই আইনের ১৮ (ক)- ধারায় বলা হচ্ছে, আগের মালিকরাও শেয়ার কিনতে পারবে। তার মানে কী? আপনি আইনের মধ্যে বলতেছেন আপনার টুল হচ্ছে ক্রিয়েশন অব দ্য ব্যাড ব্যাংক, কিন্তু আপনি আবার আইনের মধ্যেই ধারা ঢুকায় দিলেন যে আগের মালিকরা ইচ্ছা করলে কিনতে পারবে। মানে পুরো ব্যাপারটাই কনফিউজিং।’
তিনি বলেন, ‘এখন বাংলাদেশ ব্যাংক যে বলছে আগের মালিকদের ফিরে আসার কোনো পসিবিলিটি নেই— কিসের ভিত্তিতে বলছে? আমি তো বলব যে, এটার মার্জার হওয়ার পসিবিলিটিই নেই। কারণ মার্জার তো হয় ভালো ব্যাংকের সঙ্গে খারাপ ব্যাংক। আর এখানে সবগুলোই খারাপ ব্যাংক।’
