শিক্ষা খাতে ব্যয় নেমেছে জিডিপির ১.৩ শতাংশে

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: বাংলাদেশের শিক্ষা খাত এখন এক চরম বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে নতুন সরকারের পক্ষ থেকে উচ্চাভিলাষী একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে— শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয় নিশ্চিত করা, দেশজুড়ে মিড-ডে মিল চালু, বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই সেবা, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এবং ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ বলছে অন্য কথা। বাস্তবে শিক্ষা খাতে বরাদ্দের হার ধারাবাহিকভাবে কমছে। সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং শিক্ষার মান নিয়ে গভীর উদ্বেগ।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের এই সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি। সিপিডি বলছে, শিক্ষা খাতের উন্নয়নে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, বাস্তবতা তার ঠিক উল্টো। সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ২০২৫ অর্থবছর নাগাদ শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ছিল। অথচ পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬ অর্থবছরে শিক্ষা বাজেটের ব্যবহার জিডিপির ১.৮ শতাংশ থাকলেও ২০২৩ থেকে ২৫ সময়কালে তা নাটকীয়ভাবে কমে ১.৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

গবেষণায় দেখা যায়, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট দুটি প্রধান মন্ত্রণালয়েরই বাজেট ব্যবহারের সক্ষমতা কমেছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেট ব্যবহার ২০১৬ সালের জিডিপির ০.৮ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ০.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক, উচ্চ শিক্ষা, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা মিলিয়ে এই মন্ত্রণালয়ের ব্যয় বর্তমানে জিডিপির ০.৮ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে ১ শতাংশ ছিল।

দেশের শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ও বাস্তব ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, সরকার শিক্ষা খাতে যে অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে তার বড় একটি অংশ সময়মতো ব্যয়ই করা যাচ্ছে না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২৫ সময়ে মোট শিক্ষা বাজেট বাস্তবায়নের হার নেমে এসেছে ৭৬ শতাংশে। অর্থাৎ বরাদ্দের প্রায় এক-চতুর্থাংশ অর্থই খরচ করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। এই মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাস্তবায়নের হার নেমে এসেছে মাত্র ৬৬ শতাংশে। অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নের হার ৭৩ শতাংশ।

তবে সব সময় পরিস্থিতি এমন ছিল না। ২০১৬ সালে শিক্ষা বাজেট বাস্তবায়নের হার ১০০ শতাংশেরও বেশি হয়েছিল। সে সময় মোট শিক্ষা বাজেট বাস্তবায়নের হার দাঁড়ায় ১২০ শতাংশে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ছিল ১১২ শতাংশ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ১২৬ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৫ সালের অষ্টম জাতীয় বেতনস্কেল বাস্তবায়নের কারণে শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি পাওয়ায় ওই সময় শিক্ষা খাতে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

পরবর্তীকালে কোভিড মহামারির সময় ২০১৯-২০ সালে আবারও শিক্ষা খাতে ব্যয় কিছুটা বৃদ্ধি পায়। তখন স্কুলগুলোতে ডিজিটাল অবকাঠামো, অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থা, মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার জন্য অতিরিক্ত ব্যয় করা হয়। ফলে ওই সময়ে মোট শিক্ষা বাজেট বাস্তবায়নের হার দাঁড়ায় ৯০ শতাংশে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবারও শিক্ষা খাতে ব্যয়ের গতি কমে গেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্বল পরিকল্পনা এবং জবাবদিহিতার অভাবের কারণে বরাদ্দকৃত অর্থ পুরোপুরি ব্যয় করা যাচ্ছে না।

একইসঙ্গে দেশের কর-জিডিপি অনুপাতও উদ্বেগজনকভাবে কমে যাচ্ছে। ২০২৫ এ এটি নেমে এসেছে প্রায় ৬.৮ শতাংশে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের রাজস্ব আয় কম থাকলে শিক্ষা খাতে বড় বিনিয়োগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে নতুন স্কুল নির্মাণ, শিক্ষক নিয়োগ, প্রযুক্তি উন্নয়ন, গবেষণা এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের মতো উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের সংকট শুধু কম বরাদ্দের নয়; বরং বরাদ্দকৃত অর্থ দক্ষভাবে ব্যবহার করতে না পারাও বড় সমস্যা। সরকার শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিলেও বর্তমান বাস্তবতায় সেই লক্ষ্য অর্জন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিক্ষা খাতে পরিচালন ব্যয় ও উন্নয়ন ব্যয়ের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে উদ্বেগজনক পতন দেখা গেছে, যা শিক্ষা খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের পরিচালন ব্যয় বাস্তবায়নের হার ২০২৩ থেকে ২৫ সময়ে বেড়ে ৯৮ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে একই সময়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিচালন ব্যয় বাস্তবায়নের হার কমে ৮৪ শতাংশে নেমেছে। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ক্ষেত্রেও এ হার দাঁড়িয়েছে ৮৩ শতাংশে, যা কোভিড-পূর্ব সময়ের চেয়েও কম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশই মূলত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতায় ব্যয় হয়। ফলে পরিচালন বাজেটের বাস্তবায়ন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও এটি শিক্ষার মানোন্নয়ন বা দক্ষতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারছে না।

অন্যদিকে, উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ২০২৩ থেকে ২৫ সময়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের হার নেমে এসেছে মাত্র ৫৩ শতাংশে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে এটি ৪৬ শতাংশ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগেও ৪৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অথচ ২০২১-২২ সময়ে প্রাথমিক শিক্ষায় উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের হার ছিল ৯০ শতাংশ।

গবেষণায় আরও বলা হয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের মোট বরাদ্দ কিছুটা বেড়েছে ঠিকই, তবে সেই বৃদ্ধি মূলত ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণকেন্দ্রিক। বিপরীতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশিক্ষণ খাতে বরাদ্দ ২০২৫-২৬ সময়ে ২১.৩ শতাংশ কমে গেছে।

সিপিডি’র অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, বাংলাদেশের শিক্ষা খাত বর্তমানে ‘কম বরাদ্দ’ ও ‘ব্যয় করতে না পারা’র এক দুষ্টচক্রে আটকে আছে। তিনি জানান, বছরের পর বছর ধরে শিক্ষা বাজেট ধারাবাহিকভাবে আন্ডারফান্ডেড এবং আন্ডারইউটিলাইজড অবস্থায় থাকছে। এর পেছনে বড় কারণ হলো সরকারের আর্থিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। কর-জিডিপি অনুপাত কম হওয়ায় সরকার পর্যাপ্ত রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারছে না। ফলে রাজনৈতিকভাবে বড় প্রতিশ্রুতির ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।