ইসলাম আমাদের শেখায় যে, আভিজাত্য রক্তে নয়, বরং তাকওয়ায়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সোহবতে ধন্য হওয়া এই সাতজন সাহাবী কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবেন।
১. উম্মে আইমান (রা.): বারাকাহ বিনতে সালাবা, যাকে আমরা উম্মে আইমান নামে চিনি। তিনি ছিলেন নবীজির পিতা আবদুল্লাহর দাসী। মা আমিনার ইন্তেকালের পর এই ইথিওপীয় মহীয়সী নারীই রাসুল (সা.)-কে মাতৃস্নেহে লালন-পালন করেন। নবীজি তাঁকে শ্রদ্ধায় মা বলে ডাকতেন এবং বলতেন, আমার পরিবারের অবশিষ্টাংশ হলো উম্মে আইমান। তিনি ইসলামের জন্য মক্কা থেকে মদিনায় পায়ে হেঁটে হিজরত করেছিলেন।
২. ওসামা বিন জায়েদ (রা.): হযরত জায়েদ (রা.) ও উম্মে আইমান (রা.)-এর পুত্র ওসামা ছিলেন নবীজির অত্যন্ত স্নেহভাজন। তাঁর গায়ের রঙ ছিল কুচকুচে কালো। তৎকালীন আরব সমাজে যখন বংশীয় শ্রেষ্ঠত্বের দাপট ছিল, তখন রাসুল (সা.) এই তরুণ ওসামাকে রোমানদের বিরুদ্ধে বিশাল বাহিনীর প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেন। এটি ছিল বর্ণবাদের বিরুদ্ধে ইসলামের এক চূড়ান্ত চপেটাঘাত।
৩. সাদ আল-আসওয়াদ (রা.): মদিনার আনসার সাহাবী সা’দ (রা.) তাঁর গায়ের রঙের কারণে হীনম্মন্যতায় ভুগতেন। তিনি নবীজিকে প্রশ্ন করেছিলেন, কালো হওয়ার কারণে জান্নাতে কি আমার মর্যাদা কম হবে? নবীজি তাঁকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, কখনোই নয়। পরবর্তীতে এক যুদ্ধে তিনি বীরত্বের সাথে লড়াই করে শহীদ হন। তাঁর শাহাদাতের পর নবীজি (সা.) ব্যথিত হৃদয়ে তাঁর মাথা নিজের কোলে তুলে নিয়েছিলেন।
৪. আম্মার বিন ইয়াসার (রা.): ইসলামের প্রথম শহীদ সুমাইয়া (রা.)-এর পুত্র আম্মার। চরম নির্যাতনের মুখেও ইমানের পথে অটল থাকার এক অমর উপাখ্যান তিনি। আবিসিনিয়া ও মদিনা—দুই বার হিজরতের বিরল সম্মানের অধিকারী এই সাহাবী বদর থেকে শুরু করে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে রাসুলের পাশে ছায়ার মতো ছিলেন।
৫. মিহজা (রা.): হযরত মিহজা বিন সালেহ (রা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের এক অনন্য নাম। ঐতিহাসিক তাবারির বর্ণনা মতে, বদরের ঐতিহাসিক প্রান্তরে মুসলিম বাহিনীর পক্ষ থেকে তিনিই সর্বপ্রথম শাহাদাতের পেয়ালা পান করেন। জান্নাতের মেহমান হিসেবে রাসুল (সা.) তাঁর উচ্চমর্যাদার কথা ঘোষণা করেছিলেন।
৬. আবু যার আল-গিফারি (রা.): বিখ্যাত গিফারি গোত্রের এই মানুষটি ছিলেন অনাড়ম্বর জীবন ও সত্যবাদিতার প্রতীক। তিনি যখন ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন মক্কার কাফিরদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কাবার সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে তাওহিদের ঘোষণা দিয়েছিলেন। দারিদ্র্য ও খোদাভীতিতে তিনি ছিলেন সাহাবীদের মধ্যে উদাহরণস্বরূপ।
৭. আইমান (রা.): উম্মে আইমান (রা.)-এর পুত্র আইমান বিন ওবাইদ (রা.) ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান মেষপালক। হুনাইনের যুদ্ধে যখন এক ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, তখন যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন সাহাবী জীবন বাজি রেখে নবীজিকে চারপাশ থেকে আগলে রেখেছিলেন, আইমান (রা.) ছিলেন তাঁদের অন্যতম। এই যুদ্ধেই তিনি বীরত্বের সাথে লড়াই করে শাহাদাত বরণ করেন।
বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, অনারবের ওপর আরবের যেমন শ্রেষ্ঠত্ব নেই, তেমনি কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো প্রাধান্য নেই। এই সাতজন সাহাবীর জীবনকথা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের আসল পরিচয় তার কর্মে ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসায়। আধুনিক বিশ্বের বর্ণবাদ বিরোধী লড়াইয়ে এই সাহাবীদের জীবনী আজও এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।
জা. অর্থনীতি/ উমর
